অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৮:৪১ পিএম
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। টানা ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে প্রায় দেড় বছর পর ওয়ানডে ক্রিকেটে সিরিজ জয়ের মধুর স্বাদ পেল বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে ব্যাটে-বলে অপ্রতিরোধ্য পারফরম্যান্স দেখিয়ে সফরকারীদের ১৭৯ রানের বিশাল ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়েছে টাইগাররা। সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে ব্যাটিংয়ের যে দৈন্যদশা দেখা গিয়েছিল, তা ঝেড়ে ফেলে এদিন ওপেনার সৌম্য সরকার ও সাইফ হাসানের ব্যাটে ভর করে ২৯৬ রানের চ্যালেঞ্জিং পুঁজি গড়ে স্বাগতিকরা।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে নাসুম আহমেদ ও রিশাদ হোসেনের স্পিন ঘূর্ণিতে দিশেহারা হয়ে মাত্র ১১৭ রানেই গুটিয়ে যায় ক্যারিবীয়দের ইনিংস। এই জয়ের ফলে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিল বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে বাংলাদেশের দাপুটে পারফরম্যান্স সমর্থকদের মনে স্বস্তি ফিরিয়েছে।
এদিন টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। প্রথম দুই ম্যাচের হতাশা ভুলে নতুন উদ্যমে ইনিংস শুরু করেন দুই ওপেনার সৌম্য সরকার ও সাইফ হাসান। শুরু থেকেই তারা ছিলেন আক্রমণাত্মক মেজাজে। বিশেষ করে সৌম্য সরকার তার পুরোনো বিধ্বংসী রূপে ফিরে ক্যারিবীয় বোলারদের ওপর চড়াও হন। সাইফ হাসানও দেখেশুনে খেলে তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন।
পাওয়ার প্লে'র সুবিধা কাজে লাগিয়ে এবং পরবর্তীতেও নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত গতিতে রান তুলতে থাকেন এই দুজন। তাদের সাবলীল ব্যাটিংয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং আক্রমণ। উদ্বোধনী জুটিতেই তারা যোগ করেন ১৭৬ রান, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সংগ্রহের শক্ত ভিত গড়ে দেয় এবং ম্যাচের শুরুতেই টাইগারদের চালকের আসনে বসিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন পর ওয়ানডেতে বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটিতে এমন দাপুটে পারফরম্যান্স দেখা গেল।
মাত্র ৭২ বলে ৬টি চার ও ৬টি বিশাল ছক্কার সাহায্যে ৮০ রানের এক চোখ ধাঁধানো ইনিংস খেলে আউট হন সাইফ হাসান। অন্য প্রান্তে, সৌম্য সরকারও ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তিনি ৮৬ বলে ৭টি চার ও ৪টি ছক্কার সাহায্যে করেন ৯১ রান। দুজনই সেঞ্চুরির খুব কাছে গিয়েও আক্ষেপ নিয়ে মাঠ ছাড়েন। তবে তাদের গড়ে দেওয়া দুর্দান্ত প্ল্যাটফর্মের সদ্ব্যবহার করতে ব্যর্থ হন পরের ব্যাটাররা।
উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর বাংলাদেশের রানের গতি আকস্মিকভাবে মন্থর হয়ে পড়ে। নাজমুল হোসেন শান্ত ৪৪ রানের একটি ইনিংস খেললেও তা আসে বেশ ধীরগতিতে। তাওহীদ হৃদয় ২৮ রান করে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু মিডল অর্ডারে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পতনের কারণে বড় স্কোরের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা ফিকে হয়ে যায়। রিশাদ হোসেন, মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন ও নাসুম আহমেদরা ব্যাট হাতে তেমন বড় অবদান রাখতে পারেননি।
ইনিংসের একেবারে শেষ দিকে নুরুল হাসান সোহান এবং অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ দ্রুত কিছু রান যোগ করার চেষ্টা করেন। ইনিংসের শেষ বলে আউট হওয়ার আগে মিরাজ করেন ১৭ রান। আর সোহান মাত্র ৮ বলে ২টি ছক্কার সাহায্যে ১৬ রানে অপরাজিত থাকেন। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেট হারিয়ে ২৯৬ রান। এমন দুর্দান্ত শুরুর পর এই স্কোর কিছুটা কম মনে হলেও মিরপুরের উইকেটে এটি যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং ছিল।
সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে স্পিনার আকিল হোসেন ৪১ রানের বিনিময়ে ৪টি উইকেট শিকার করে বাংলাদেশের রানের গতি কিছুটা হলেও টেনে ধরেন।২৯৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বাংলাদেশি স্পিনারদের তোপের মুখে পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বিশেষ করে বাঁহাতি স্পিনার নাসুম আহমেদের ঘূর্ণিতে দিশেহারা হয়ে পড়ে তাদের টপ অর্ডার। দলীয় মাত্র ৩৫ রানের মধ্যেই তিন তিনটি উইকেট হারিয়ে চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে সফরকারীরা।
অধিনায়ক শাই হোপকেও দ্রুত ফিরিয়ে দেন আরেক স্পিনার তানভির ইসলাম। এরপর মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেনের। তার গুগলিতে আরও খেই হারিয়ে ফেলে ক্যারিবীয় ব্যাটিং লাইনআপ। শুরুর এই ব্যাটিং ধস ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর সামলে উঠতে পারেনি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে তারা। বাংলাদেশের স্পিনারদের সামনে তাদের কোনো ব্যাটারই থিতু হতে পারেননি।
শেষের দিকে জাস্টিন গ্রেভস এবং আগের ম্যাচের নায়ক আকিল হোসেন পরাজয়ের ব্যবধান কমানোর কিছুটা চেষ্টা করেন মাত্র। দশ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে আকিল হোসেনের ব্যাট থেকে আসে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ২৭ রান। কিন্তু তা কেবল ক্যারিবীয়দের হারের ব্যবধানই কমাতে পেরেছে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১১৭ রানেই অলআউট হয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশ পায় ১৭৯ রানের বিশাল এক জয়। বাংলাদেশের হয়ে নাসুম আহমেদ ও রিশাদ হোসেন উভয়েই ৩টি করে উইকেট শিকার করেন।
এছাড়া অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ এবং তানভির ইসলাম ২টি করে উইকেট লাভ করেন। এই জয়ের ফলে দেড় বছরের ওয়ানডে সিরিজ খরা কাটাল বাংলাদেশ। আগামী সোমবার, ২৭ অক্টোবর, চট্টগ্রামে শুরু হবে দুই দলের মধ্যকার তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। ওয়ানডে সিরিজ জয়ের এই আত্মবিশ্বাস টি-টোয়েন্টি সিরিজেও টাইগারদের ভালো খেলতে অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে আশা করা হচ্ছে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন