বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
মেরু অঞ্চলের সংকট

অ্যান্টার্কটিকায় শীতেও কমছে বরফ: বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ১১:৩৭ এএম

অ্যান্টার্কটিকায় শীতেও কমছে বরফ: বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে তীব্র বরফ সংকট দেখা দিয়েছে। উপগ্রহভিত্তিক পর্যবেক্ষণ শুরুর পর থেকে চলতি বছরে শীতকালীন সমুদ্রের বরফের বিস্তার তৃতীয় সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, সমুদ্রের বরফ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার এই পরিস্থিতি আর দূরবর্তী ভবিষ্যতের শঙ্কা নয়, বরং বর্তমান পৃথিবীর জন্য এক তাৎক্ষণিক ও গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে।

উপগ্রহীয় পরিমাপে বরফ হ্রাসের এই চিত্র স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর অ্যান্টার্কটিকায় সমুদ্র বরফের সর্বোচ্চ বিস্তার রেকর্ড করা হয় এক কোটি ৭৫ লাখ ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার। দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ বর্গকিলোমিটার কম, যা আয়তনের দিক থেকে স্পেনের মতো দুটি রাষ্ট্রের সমান। গবেষকদের মতে, উপগ্রহ পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে সর্বনিম্ন সমুদ্র বরফ রেকর্ডের শীর্ষ চারটি ঘটনাই ঘটেছে গত চার বছরের মধ্যে। কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল স্নো অ্যান্ড আইস ডেটা সেন্টারের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. ওয়াল্ট মেয়ার জানান, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গঠনের পরিবর্তনশীল প্রকৃতির কারণে সর্বোচ্চ সীমা নিশ্চিত করতে কিছুটা সময় পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। তবে ১৪ সেপ্টেম্বরের পর থেকে টানা বরফের বিস্তার কমতে থাকায় বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে চলতি বছরের জন্য বরফ বৃদ্ধির সর্বোচ্চ স্তর পার হয়ে গেছে।

স্বাভাবিক ঋতুচক্রে অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্র বরফ প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে গলে ২০ লাখ বর্গকিলোমিটারের নিচে নামে এবং শীতে জমে আবার এক কোটি ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিরিক্ত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে শীত ও গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমেই আশঙ্কাজনক হারে বরফ গলে নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণাঞ্চলীয় মহাসাগর বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. আরিয়ান পিউরিচ বলেন, পরপর চার বছর সর্বনিম্ন বরফ পাওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার স্বাভাবিক ছন্দ বদলে গেছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বরফের প্রাকৃতিক আচরণ স্থায়ীভাবে বদলে যাওয়ার স্পষ্ট সংকেত।

মেরু অঞ্চলে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা গেছে।

চলতি বছরের জুন মাসে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় এবং সাগরের বিস্তৃত অঞ্চলে জমে থাকা বরফের স্থানে খোলা পানি চোখে পড়ে। আগস্টের শুরুর দিকে আমুন্ডসেন সাগরেও বরফের স্তর অস্বাভাবিক হারে কমে যায়। ড. পিউরিচ এবং অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া ব্যুরোর গবেষক ড. ফিল রিড উল্লেখ করেছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো প্রবাহ এবং অস্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ এই বরফ ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করেছে। এর পাশাপাশি কোনো সাময়িক আবহাওয়া চক্র ছাড়াও সামগ্রিক সমুদ্রের পানির উচ্চ তাপমাত্রাই বরফ গলে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।

বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বরফস্তর কমে যাওয়ায় উন্মুক্ত মহাসাগরের পানি সৌরশক্তি থেকে আরও বেশি পরিমাণে তাপ শোষণ করছে। ভাসমান সামুদ্রিক বরফ গলে গেলে সরাসরি সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি না পেলেও, তা উপকূলীয় হিমবাহকে আগলে রাখা সুবিশাল আইস শেলফগুলোকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে ফেলে। এসব আইস শেলফ ভেঙে পড়লে স্থলভাগের বিশালাকার বরফখণ্ড সরাসরি সমুদ্রে পতিত হবে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কয়েক মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই দ্রুত রূপান্তর অ্যালগি, ক্রিল ও এম্পেরর পেঙ্গুইনসহ বহু মেরুজ প্রাণীর স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলকে তীব্র অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বরফ গবেষক ড. উইল হবস জানান, সর্বোচ্চ বিস্তারে পৌঁছানোর পর থেকেই অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্র বরফ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক দ্রুত হারে কমছে। আগামী গ্রীষ্মেও যদি রেকর্ড পরিমাণ বরফ গলন অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু বিপর্যয় আরও তীব্র হবে।