অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
দেশ থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা তিল এখন বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য। একসময় যে ফসল চাষ করতে কৃষকরা চরম অনাগ্রহ দেখাতেন, আজ সেটিই তাদের ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন, তাইওয়ান, কোরিয়া ও থাইল্যান্ডে রপ্তানি হচ্ছে এই তিল।
এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এক উদ্যোক্তার দীর্ঘ সংগ্রাম। পারিবারিকভাবে দাদা ও বাবার কৃষি ব্যবসার পটভূমি থাকায় ছোটবেলা থেকেই তাঁর কৃষির প্রতি আগ্রহ ছিল। কোরিয়ায় থাকাকালীন সেখানকার ব্যবসায়ীদের পরামর্শে তিনি তিল নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পান। কিন্তু দেশে ফিরে দেখেন, তিলের উৎপাদন প্রায় শূন্য।
হতাশ হলেও হাল ছাড়েননি তিনি।
শুরুর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। তিল নিয়ে কাজ শুরু করায় অনেকেই তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করেছেন। কৃষকদের কাছে গেলে তারা চাষ করতে রাজি হতেন না। তিল বিক্রি করতে না পারার ভয়ে কৃষকরা শর্ত জুড়ে দিতেন, স্ট্যাম্পে সই করে তিল নেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। সে সময় ২০ টাকা কেজির তিল তিনি ৪০ টাকায় কিনে কৃষকদের অবাক করে দেন।
আর সেই তিলের দাম এখন বাজারে ১৮০ থেকে ক্ষেত্রবিশেষে ৩০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক পরিসরে এর আবাদ হচ্ছে। কুমিল্লা, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও উল্লাপাড়ায় প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে কৃষকদের তিল চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। ফসল উৎপাদনের পর তা কিনে নেওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়ায় কৃষকরাও এখন আগ্রহী।
দেশে বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয়টি ভিন্ন জাতের তিল প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে, যার প্রতিটির রয়েছে বিশেষ গুণ। কুমিল্লার তিলের এসিড ভ্যালু দুইয়ের নিচে, যা মানবদেহের জন্য খুবই উপকারী। এর আরেকটি জাতের এসিড ভ্যালু তিন। ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর তিলের রং সুন্দর হলেও এসিড ভ্যালু কিছুটা বেশি। কালো তিল এবং এর তেল শরীরের ব্যথা উপশম ও ত্বকের যাবতীয় সমস্যা সমাধানে দারুণ কার্যকর। লাল তিল থেকে উৎপাদিত তেল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভেষজ পণ্য ও সসে ব্যবহৃত হয়। সাদা তিল পুষ্টিগুণে অনন্য।
প্রতিদিন মাত্র এক থেকে দুই গ্রাম সাদা তিল খেলে শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হয় এবং ব্যথা দূর হয়। অন্যদিকে, পাহাড়ে উৎপাদিত ছোট কালো তিলের কদর বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পাহাড়ি আবহাওয়ায় জন্মানো এই তিলে ‘সিসাটিয়াম’ নামের একটি বিশেষ উপাদান থাকে, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। মূলত এই উপাদানটির জন্যই চীনা ক্রেতারা পাহাড়ি কালো তিল কিনতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা করেন।
জমি থেকে সংগ্রহের পর তিল সরাসরি রপ্তানি হয় না। প্রথমে মাঠে শুকিয়ে এর আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এরপর মেশিনের সাহায্যে নিখুঁতভাবে ধুলা, বালি, পাথর ও অন্যান্য ময়লা পরিষ্কার করে তবেই তা বিদেশে পাঠানো হয়। বিলুপ্তপ্রায় একটি পণ্য নিয়ে কাজ করে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়ায় এই উদ্যোক্তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন। সরকারি সঠিক নির্দেশনা ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে আগামীতে তিল বাংলাদেশের কৃষি খাতে গর্ব করার মতো একটি শীর্ষ পণ্যে পরিণত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন