রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

হাওড়ে হারভেস্টার আসায় কাজ হারিয়ে ঢাকা ছুটছেন শ্রমিকেরা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

জুন ১৩, ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম

হাওড়ে হারভেস্টার আসায় কাজ হারিয়ে ঢাকা ছুটছেন শ্রমিকেরা

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওড় এলাকার কৃষিতে গত এক দশকে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ায় বদলে গেছে ধান কাটার চিরচেনা দৃশ্য। তবে এই যান্ত্রিকীকরণের ফলে হাওড়াঞ্চলের হাজার হাজার কৃষি শ্রমিক দীর্ঘদিনের চেনা কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন। এক সময় বোরো কিংবা আমন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দল বেঁধে শ্রমিকেরা আসতেন হাওড়ের ফসল ঘরে তুলতে। 

আধুনিক কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের আগ্রাসনে এখন মাঠ পর্যায়ে শ্রমিকদের আর আগের মতো চাহিদা দেখা যাচ্ছে না।হাওড়ের হাজারো শ্রমিক এখন কর্মহীন।নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওড়ে আগে যেখানে শত শত শ্রমিকের কোলাহল থাকত, এখন সেখানে কেবল হাতে গোনা কয়েকজনের দেখা মেলে। তীব্র শ্রমিক সংকটের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কিছু শ্রমিক তাদের দৈনিক মজুরি বাড়ালেও সার্বিক কাজের দিন অনেক কমে গেছে। 

আগে একজন শ্রমিক পুরো মৌসুমে ধান কেটে ভালো টাকা সঞ্চয় করতে পারতেন যা দিয়ে তার পুরো বছরের সংসার চলত। এখন ধান কাটার আধুনিক যন্ত্র আসার পর স্থানীয় গৃহস্থরা আর সাধারণ দিনমজুরদের কাজে নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে বছরের একটা বড় সময় হাওড়ের আদিবাসীদের সম্পূর্ণ বেকার বসে থাকতে হচ্ছে।বিগত ২০২০ সালে সরকার তিন শ দুই কোটি টাকার একটি বিশাল কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প দেশজুড়ে চালু করেছিল। 

এই প্রকল্পের আওতায় হাওড়ের বড় বড় জমিতে ধান কাটার জন্য ভর্তুকি মূল্যে জাপানি কম্বাইন হারভেস্টার সরবরাহ করা শুরু হয়। একেকটি আধুনিক হারভেস্টার মেশিন মাঠে একাই প্রায় দুই শ শ্রমিকের সমান কাজ দ্রুত সম্পাদন করতে পারে। বাজারভেদে এই যন্ত্রগুলোর দাম ২৮ থেকে ৩২ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে যার মধ্যে সরকার প্রায় ১৯ থেকে ২২ লাখ টাকা ভর্তুকি দেয়। বাকি আট থেকে ১০ লাখ টাকা একজন কৃষক বা জমির মালিককে নিজের তহবিল থেকে পরিশোধ করতে হয়।

উচ্চ মূল্যের কারণে এই আধুনিক কৃষি যন্ত্রগুলো সাধারণ ও প্রান্তিক কৃষকদের নাগালের বাইরে থেকে গেছে। কেবল এলাকার বিত্তবান বা বড় ইজারাদারেরাই এই বিশাল প্রকল্পের সুবিধা পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছেন। নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলে এমন প্রায় এক হাজার আধুনিক কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন মাঠে নামানো হয়েছে যা দ্রুত ধান কাটার কাজ শেষ করছে। জমি চাষ ও ফসল তোলার কাজে গতি আসায় জমির মালিকেরা খুশি হলেও ভূমিহীন দিনমজুরদের কপাল পুড়েছে। শত শত মানুষের রুজি এক নিমেষেই কেড়ে নিয়েছে এই যান্ত্রিক ব্যবস্থা।

কিন্তু আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে যন্ত্রের মালিকেরাও এখন নতুন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। গত কয়েক বছর ধরে বোরো মৌসুমের শেষ দিকে একটানা তিন থেকে চার মাস ধরে ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হচ্ছে। অতি বৃষ্টির ফলে হাওড়ের নিচু জমিগুলো গভীর কাদা ও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ভারী হারভেস্টার মেশিনগুলো মাঠে নামানো যাচ্ছে না। জমিতে অতিরিক্ত কাদা থাকার কারণে চাকা দেবে গিয়ে যন্ত্রের কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে যেমন কৃষকের ফসল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি টাকার যন্ত্র কিনে মালিকেরাও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না।

মেশিন বিকল হলে কৃষকেরা আবার পুরোনো দিনমজুরদের কাছে ফিরে আসছেন কিন্তু ততদিনে অনেক শ্রমিক এলাকা ছেড়েছেন। কাজ না থাকায় এবং হাওড়ে টিকে থাকার কোনো বিকল্প পথ না পেয়ে অনেকেই গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। নদীভাঙন, বন্যা ও যান্ত্রিকীকরণের ত্রিমুখী চাপে পড়ে হাওড়ের তরুণ ও মধ্যবয়সী শ্রমিকেরা দলে দলে রাজধানী ঢাকার দিকে ছুটছেন। জীবিকার তাগিদে চেনা কৃষিজমি ছেড়ে ইট-পাথরের শহরে এসে তারা যাতায়াত ও পরিবহনের মতো কঠিন পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে এখন হাওড় থেকে আসা মানুষের ভিড় বাড়ছে।

শুধু ঢাকার ভাটারা ও বাড্ডা এলাকাতেই গত কয়েক বছরে হাওড় অঞ্চল থেকে আসা হাজারেরও বেশি পরিবার স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছে। পুরো রাজধানী জুড়ে এই সংখ্যা ঠিক কত হাজার তা সুনির্দিষ্টভাবে কোনো সরকারি পরিসংখ্যানে উল্লেখ নেই। গ্রামে স্বাধীনভাবে কৃষিকাজ করা মানুষগুলো এখন ঢাকার রাস্তায় রিকশা চালিয়ে বা দিনমজুরি করে কোনো রকমে টিকে আছেন। প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে যা আয় হয় তার একটা বড় অংশ চলে যায় গ্যারেজের দৈনিক ভাড়া ও মহাজনের কিস্তির টাকা শোধ করতে। বাসা ভাড়া ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শহরের রাস্তাগুলোতে হঠাৎ করে রিকশার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনেও গ্রামীণ কর্মসংস্থান ধ্বংসের এই প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন কর্মহীন মানুষ ঢাকায় আসায় একদিকে যেমন যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে লাখো কর্মঘণ্টা। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকি ও কৃষিতে চরম অনিশ্চয়তার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি তার নিজস্ব ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। কৃষি খাতে আধুনিকায়নের সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে না পৌঁছে উল্টো তাদের শহরমুখী উদ্বাস্তু হতে বাধ্য করছে। এই তীব্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের দায় কার তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

হাওড়ের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সচল রাখতে এখনই নতুন কোনো বিকল্প কর্মমুখী পরিকল্পনা প্রয়োজন। যান্ত্রিকীকরণের পাশাপাশি কৃষি শ্রমিকদের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি না করলে শহরের ওপর এই বাড়তি জনসংখ্যার চাপ কমানো অসম্ভব। স্থানীয় পর্যায়ে মৎস্য চাষ বা ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে এই বিশাল শ্রমশক্তিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতেই ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই বিশাল ঢাকামুখী স্রোত এবং হাওড়ের মানবিক বিপর্যয় রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।