রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬,

ল্যাম্পপোস্টের নিচে পড়াশোনা করা নিরবের পাশে নীলফামারীর ডিসি

শহিদুল ইসলাম

জুলাই ১৭, ২০২৬, ১০:৩২ পিএম

ল্যাম্পপোস্টের নিচে পড়াশোনা করা নিরবের পাশে নীলফামারীর ডিসি

ছবি: দিনাজপুর টিভি নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্ধকার ঘরে কুপির তেল ফুরিয়ে গেলেও নিভে যেতে দেওয়া যায় না স্বপ্ন। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই সাত বছরের একরত্তি শিশু নিরব ছুটে যেত নীলফামারী রেলওয়ে স্টেশনে। ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের ল্যাম্পপোস্টের সেই আবছা হলদে আলোতেই সে খুঁজতো নিজের ভবিষ্যৎ, বুকে লালন করতো বড় হয়ে একদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবময় কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন।ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে নিরবের এই আলো খোঁজার হৃদয়স্পর্শী গল্পটি সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিষয়টি নজরে আসে নীলফামারীর মানবিক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামানের। 

আর তাতেই বদলে যায় গল্পটি। ল্যাম্পপোস্টের নিচে একা একা লড়াই করা সেই ছোট্ট নিরবের পাশে পরম মমতায় এসে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন।শুক্রবার বিকেলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান নিজে ছুটে যান নীলফামারী রেলওয়ে স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন নিরবদের সেই জরাজীর্ণ ছোট্ট ঘরে। পরম স্নেহে নিরব ও তার পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন। নিরবের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে জেলা প্রশাসন এখন তার পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং স্থায়ী বাসস্থানের দায়িত্ব নিয়েছে।

ভবিষ্যতের এক সেনা কর্মকর্তাকে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে জেলা প্রশাসক বলেন, গণমাধ্যমে সংবাদটি দেখার পর থেকেই শিশু নিরবের জন্য আমার মনটা কাঁদছিল। বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই, কুপির তেল কেনার সামর্থ্য নেই—তবুও পড়াশোনার প্রতি তার এই অদম্য স্পৃহা বিস্ময়কর। বড় হয়ে সে দেশের সেবা করতে চায়, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হতে চায়। তার এই স্বপ্নকে আমরা কিছুতেই মরে যেতে দিতে পারি না।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি শিশু পরিবারের মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ পড়াশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া নিরব বর্তমানে কিছুটা অসুস্থ থাকায় তার দ্রুত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরিবারটি বর্তমানে রেলওয়ের জমিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। তাদের একটি স্থায়ী ও নিরাপদ ঠিকানা করে দিতে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সরকারি খাস জমি খুঁজে স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের এমন মানবিক ও যুগান্তকারী উদ্যোগে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নিরবের মা রুপসানা বেগম। সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ যেখানে ল্যাম্পপোস্টের আলোর মতো মিটিমিটি জ্বলছিল, সেখানে আজ আশার প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি প্রশাসনের এই উদ্যোগে পরম সানন্দে সম্মতি জানান।

পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মনোয়ারুল ইসলাম, নীলফামারী সরকারি শিশু পরিবার বালকের উপ-তত্ত্বাবধায়ক শাহ মো. আল আমিনসহ জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ। সবার প্রত্যাশা, নিরব একদিন সত্যি সত্যিই সবুজ ইউনিফর্ম গায়ে জড়িয়ে দেশের সেবা করবে এবং তার এই লড়াই বাকি হাজারো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।