নভেম্বর ৭, ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
স্বজন হারানোর শোক আর স্মৃতির আবহে প্রদীপের আলোয় আলোকিত হতে যাচ্ছে উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ বরিশালের কাউনিয়া মহাশ্মশান। শনিবার সন্ধ্যায় শ্মশান দীপাবলি উৎসবে মৃত স্বজনদের সমাধিতে মোমবাতি ও প্রদীপ প্রজ্বালন করে শ্রদ্ধা জানাবেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশ থেকে আসা হাজারো মানুষ। এ উৎসবে দেড় লাখের বেশি মানুষের সমাগমের প্রত্যাশা করছে আয়োজক কমিটি। এই উৎসব উপলক্ষে দুই শতাধিক বছরের পুরোনো এই মহাশ্মশানে সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং নেওয়া হয়েছে কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা।
প্রতি বছর ভূত চতুর্দশীর পুণ্যতিথিতে বরিশাল মহাশ্মশানে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের আয়োজন করা হয়। এবারও উৎসবকে ঘিরে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে পুরো শ্মশান চত্বর। প্রিয়জনদের সমাধি ধোয়া-মোছা, পরিষ্কার ও রং করার যাবতীয় কাজ শেষ হয়েছে। শ্মশানের ভেতরের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোও পরিষ্কার করা হয়েছে। যেসব সমাধিতে কোনো স্বজন নেই, সেগুলোর দেখভাল ও পরিচ্ছন্নতার কাজও কমিটির পক্ষ থেকে সম্পন্ন করা হয়েছে। শুক্রবার রাতের মধ্যেই শ্মশানের রং ও আলোকসজ্জার সব কাজ শেষ হয়েছে।
ঐতিহাসিক এই মহাশ্মশানটিতে সংরক্ষিত রয়েছে কবি জীবনানন্দ দাশের পিতা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ গুপ্ত, বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, নারী নেত্রী মনোরমা বসু মাসীমা, বামপন্থি নেতা হিরণলাল ভট্টাচার্য, কংগ্রেস নেতা শৈলেশ্বর চক্রবর্তী ও নারী নেত্রী রানী ভট্টাচার্যসহ বহু গুণী ব্যক্তির স্মৃতিচিহ্ন। ২০১২ সালে ভারতের কেওড়াতলা মহাশ্মশান থেকে মাটি এনে এখানে অশ্বিনীকুমার দত্তের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়। এ ছাড়া সেখানে স্থাপন করা হয়েছে তাঁর স্মারক সমাধি ও ম্যুরাল। আদি শ্মশানে রয়েছে ব্রাহ্ম অনুসারীদের পৃথক সমাধি।
শ্মশান রক্ষা কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ একর ৯৬ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই মহাশ্মশানে কাঁচা-পাকা মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার সমাধি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় নয়শ সমাধির স্বজন বর্তমানে দেশের বাইরে বসবাস করছেন। এ ছাড়া সেখানে রয়েছে প্রায় নয়শ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির সমাধি। এই অজ্ঞাতপরিচয় সমাধিগুলো হলুদ রং দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে।
আয়োজকরা জানান, দীপাবলি উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো মৃত স্বজনদের সমাধিতে মোমবাতি ও প্রদীপ প্রজ্বালন করা। পাশাপাশি তাঁদের প্রিয় খাবার ও পছন্দের সামগ্রী সমাধিতে নিবেদন করা হয়। ফুল দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো হয় সমাধি প্রাঙ্গণ। সন্ধ্যায় পূজা উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকেও মোমবাতি, ধূপকাঠি ও প্রদীপ প্রজ্বালনের বিশেষ আয়োজন থাকবে।
বরিশাল মহাশ্মশান দীপাবলি ও কালীপূজা উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব বিজয় ভক্ত বলেন, ভূত চতুর্দশীর পুণ্যতিথিতে প্রতি বছরের মতো এবারও দীপাবলি উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে এবং শ্মশানের সব প্রস্তুতি সফলভাবে শেষ হয়েছে। তিনি আরও জানান, ১৯২৭ সাল থেকে বরিশাল মহাশ্মশানে ধারাবাহিকভাবে আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে এই দীপাবলি উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশ এবং বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকেও মানুষ এই উৎসবে যোগ দিতে আসেন। ইতিমধ্যে বিদেশি অনেক অতিথি বরিশালে এসে পৌঁছেছেন এবং তাঁরা বিভিন্ন হোটেল ও আত্মীয়স্বজনের বাসায় অবস্থান করছেন।
এই উৎসবে বিপুল পরিমাণ মানুষের সমাগমের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুরো শ্মশানজুড়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। কমিটির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি পুলিশ, আনসার এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক দল মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করবে। যেকোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের একটি দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৮০১ সালের ১ মে তৎকালীন জেলা প্রশাসক জন শ্যোর বাকেরগঞ্জ থেকে জেলার সদর দপ্তর বর্তমান বরিশালে স্থানান্তর করেন। এর পর থেকেই প্রশাসনিক ও নগরকেন্দ্রিক জনবসতি গড়ে ওঠার ধারাবাহিকতায় নতুন বাজার এলাকায় জেলখালসংলগ্ন স্থানে প্রথম মহাশ্মশানের যাত্রা শুরু হয়। সেখানে সমাধির সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে পরবর্তী সময়ে কাউনিয়া এলাকায় বর্তমান মহাশ্মশান গড়ে ওঠে। ১৮৭৬ সালে বরিশাল পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর মহাশ্মশানটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন