অক্টোবর ৩, ২০২৬, ০২:৩০ পিএম
দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানো এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর ব্যয়বহুল নির্ভরতা কমিয়ে আনতে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ জেলা ভোলার গ্যাসসম্পদ। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাহিদামতো জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় জাতীয় সঞ্চালন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা ভোলার বিপুল গ্যাস কীভাবে দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, সেদিকেই নজর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা। জেলাটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য মজুত থাকা সত্ত্বেও মূলত সঞ্চালন অবকাঠামোর অভাবে পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ১৯ শতাংশের মজুত রয়েছে ভোলায়। জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ভোলার আবিষ্কৃত শাহবাজপুর, ভোলা-নর্থ ও ইলিশা নামের তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে মোট মজুত রয়েছে প্রায় ২ দশমিক ০৪৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ১ দশমিক ৪৩২ থেকে ১ দশমিক ৪৩৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরাসরি উত্তোলনযোগ্য।
বাপেক্সের তথ্যে দেখা যায়, জেলায় খনন করা নয়টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সঞ্চালন অবকাঠামোর অভাবে প্রতিদিন আরও প্রায় ৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুরোপুরি অব্যবহৃত পড়ে থাকছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান জানান, ভোলার গ্যাস কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে উৎপাদনের পাশাপাশি পাইপলাইন বা সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মজুত থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানোর ব্যবস্থা না করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে এর সুফল মিলবে না।
জাতীয় গ্রিডে গত ১৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক ২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এই সরবরাহের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসে প্রায় ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে আসে প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। আমদানিনির্ভর এই গ্যাস আনতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ভোলা-বরিশাল রুটের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। পাইপলাইনটি খুলনা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা সম্ভব হলে তা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে নতুন গতি সঞ্চার করবে। শুধু জাতীয় গ্রিডে নেওয়াই নয়, ভোলায় স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস ব্যবহারের বড় সুযোগ রয়েছে। সেখানে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সুবিধা দিলে নতুন সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পপার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব। সড়ক, নদীবন্দর, আবাসন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন হলে জেলাটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পাঞ্চলে রূপ নিতে পারে।
উৎপাদন বাড়াতে ভোলা নর্থ-১, ভোলা নর্থ-২ ও ইলিশা-১ কূপ থেকে দৈনিক অতিরিক্ত ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার লক্ষ্যে নতুন প্রসেস প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ চলছে, যা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এর পাশাপাশি আরও পাঁচটি নতুন অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার গ্যাসপ্রমের সহায়তায় পরিচালিত সমীক্ষায় চরফ্যাশনসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় আরও বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ গ্যাস পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনার কথা জানা গেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী করা, মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি এবং সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম উল্লেখ করেন, ভোলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা শুধু কত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেল তা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। বিদ্যুৎ, সার, স্থানীয় শিল্প ও জাতীয় গ্রিডের মধ্যে কোথায় গ্যাস ব্যবহার করলে জাতীয় অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ মূল্য সংযোজন হবে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বড় বিনিয়োগের আগে অনুসন্ধান কূপ খনন ও চাপ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাস্তব উত্তোলনযোগ্য মজুত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভোলার শিল্পোদ্যোক্তা ও স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি কার্যকর নদীবন্দর, বিদ্যুৎ এবং উন্নত সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত না করলে শুধু গ্যাসের উপস্থিতিতে শিল্প বিপ্লব ঘটবে না। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন এবং দেশজুড়ে বাপেক্সের ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা এগিয়ে চলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবেশগত সুরক্ষার সাথে সমন্বয় রেখে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার মাধ্যমেই ভোলার এই ভূগর্ভস্থ সম্পদ জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র: বাসস

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন