সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
মাদারীপুরের শতবর্ষী চরমুগরিয়া বন্দরের ঐতিহ্য ও পরিচিতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মুক্তভাবে বিচরণ করা প্রায় দেড় হাজার বানর। স্থানীয় মানুষের সাথে দীর্ঘ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই প্রাণীগুলো এখন তীব্র খাদ্যসংকট, আবাসস্থল ধ্বংস এবং মানুষের সাথে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময়ের ফলদ গাছপালা উজাড় হওয়া এবং সরকারি খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দিন দিন কমছে এদের সংখ্যা।
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভারতের নদিয়া ও শান্তিপুর অঞ্চল থেকে অনেক বানর নদীপথে এই নদীবন্দর এলাকায় আসে।
অনুকূল পরিবেশ পেয়ে বানরগুলো স্থায়ীভাবে চরমুগরিয়া এলাকায় বংশবৃদ্ধি শুরু করে। সেই সময় কয়েক হাজার বানর থাকলেও প্রকৃতির সাথে লড়াই ও খাদ্যসংকটে এদের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পায়। মাত্র কয়েক বছর আগেও এলাকায় প্রায় দেড় হাজার বানর দেখা গেলেও বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। খাবারের খোঁজে অনেক বানর ইতিমধ্যে মাদারীপুর জেলা সদরসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও চলে গেছে। বর্তমানে চরমুগরিয়ায় ঠিক কতটি বানর অবশিষ্ট রয়েছে তা নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে এই সংখ্যা এখন প্রায় এক হাজার।
অতীতে এই বানরগুলো মূলত ছয়টি দলে বিভক্ত হয়ে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় সুশৃঙ্খলভাবে বাস করত। যার মধ্যে ছিল চরমুগরিয়ার কালীবাড়ী, তৎকালীন পাট ক্রয় কেন্দ্র বা জেটিসি ফাঁড়ি এলাকা, জেমস একাডেমি, নদীর পাড়, স্বর্ণকারপট্টির একাংশ, চৌরাস্তা ও জমাদ্দার মিল এলাকা। এক এলাকার বানরের দল অন্য এলাকার সীমানায় প্রবেশ করত না, আর ভুলবশত ঢুকে পড়লে দলগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই বেঁধে যেত।

তবে সেই দৃশ্য এখন অতীত। খাদ্যসংকটের তীব্রতায় বানরগুলো তাদের নিজস্ব অঞ্চল ছেড়ে শহরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষুধার তাড়নায় এরা মানুষের বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও খাবারের দোকানে ঢুকে খাবার ছিনিয়ে নিচ্ছে। খাবার না পেয়ে এবং মানুষের পিটুনিতে প্রতিনিয়ত কমছে এই প্রাণীর সংখ্যা।
অতীতে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় এসব বানর চরম খাদ্যসংকটে পড়ে এবং বিপুলসংখ্যক প্রাণী মারা যায়। ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় নবী সাহেব নামের এক পাট কর্মকর্তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। বিষয়টি তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফরহাদ রহমানের নজরে এলে তিনি সরকারের পরিবেশমন্ত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর কাছে বানর রক্ষার আবেদন জানান। তখন মন্ত্রণালয় বানভাসি মানুষের ত্রাণের পাশাপাশি বানরদের জন্যও জরুরি ত্রাণ বরাদ্দ মঞ্জুর করে।
পরবর্তীতে ১৯৯৯ সাল থেকে আবারও খাদ্যের তীব্র অভাব দেখা দেয়।
২০০৩ সাল থেকে ফ্রেন্ডস অব নেচার নামের একটি স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন প্রতি শুক্রবার বানরদের নিয়মিত খাবার বিতরণ শুরু করে। পাশাপাশি ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেসিডিপি নামের একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মজিবুল হক দুলু প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে বানরদের খাবার সরবরাহ করেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে বন বিভাগ থেকে ১ কোটি টাকার একটি সমন্বিত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এর আওতায় বানরদের জন্য দৈনিক ১২ হাজার ৫০০ টাকার খাদ্য বিতরণ, একটি স্থায়ী থাকার শেড নির্মাণ এবং ফলদ বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি শেড নির্মাণ করা হলেও দেখভালের অভাবে লাগানো গাছগুলো মারা যায়।
এরপর দুই দফায় সরকারি বরাদ্দ এলেও তা নিয়মিত ছিল না। খাদ্যহীনতায় অনেক সদ্যোজাত বানরের ছানাসহ প্রাপ্তবয়স্ক বানর মারা যায়। দীর্ঘদিন পর ২০২২ সালে বানরের খাবারের জন্য ২৯ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ ২৩ লাখ টাকার বিশেষ বরাদ্দ আসে। তবে গত বছর সেই অর্থ পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার পর নতুন কোনো বরাদ্দ আসেনি।
বর্তমানে সরকারি কোনো বরাদ্দ না থাকায় বানরদের অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। অন্যদিকে বন বিভাগ চরমুগরিয়ার নয়াচরে একটি ইকোপার্ক নির্মাণের মাধ্যমে বানরদের স্থায়ী অভয়ারণ্য তৈরির প্রকল্প হাতে নিলেও স্থানীয় জমি সংক্রান্ত মামলার কারণে সেই কাজ বন্ধ রয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে শহরে ছড়িয়ে পড়া বানরগুলোকে এক ছাতার নিচে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফ্রেন্ডস অব নেচারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাজন মাহমুদ বলেন, প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকা এই প্রাণীগুলো আজ খাবারের অভাবে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। ঐতিহ্যবাহী এই প্রাণীকুল রক্ষায় সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং নয়াচরের ইকোপার্কটি দ্রুত চালু করে একটি সুনির্দিষ্ট অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা জানান, খাবারের অভাবে বানরগুলো হিংস্র হয়ে এক পলকে মানুষের হাত থেকে খাবার ছিনিয়ে নিয়ে পালায়। ফলে অনেক সময় লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে তাদের প্রতিহত করতে হয়, যা মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব তৈরি করছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন