সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১০:১৭ এএম
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগেই করা হয়েছিল। ছবি তোলা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে ভিডিও তৈরির সূত্রে গ্রেপ্তার আসামিদের সঙ্গে তার পরিচয় গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে তার ব্যবহৃত দামি মুঠোফোন আইফোনের প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে এই কিশোরকে হত্যার নীল নকশা তৈরি করে আসামিরা।
আদালতে দেওয়া তিন আসামির ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জবানবন্দির ভাষ্যমতে, টিকটকে যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় ছবি তোলার কথা বলে ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর তার হাত থেকে আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হলে কোদালের হাতল দিয়ে মাথায় ও শরীরে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়।
আদালতের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া এবং মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার বিবরণে আসামিদের তথ্যে মিল থাকলেও ঘটনার নির্দিষ্ট সময় নিয়ে সামান্য ভিন্নতা দেখা গেছে। গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। তার বক্তব্য অনুসারে, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তার বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে চড়ে ছবি তোলা ও ভিডিও নির্মাণের উদ্দেশ্যে অপ্রতিম প্রায়ই তাদের সঙ্গে ঘুরতে যেত।
তুহিন দাবি করেছে, অপ্রতিমের মুঠোফোনটির ওপর সে নিজে এবং অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত আরেক কিশোরের তীব্র লোভ তৈরি হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তাদের দুজনের বৈঠক হয় এবং সেখানেই ছিনতাই ও হত্যার পরিকল্পনা পাকা করা হয়। দোকানে কর্মরত কিশোরটিও আদালতে পূর্বের শুক্রবারের সেই গোপন বৈঠকের বিষয়টি স্বীকার করেছে। তবে সে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনার দায় চাপিয়েছে তুহিনের ওপর। তার ভাষ্য ছিল, তুহিন একাই আইফোনের লোভে অপ্রতিমকে মেরে ফেলার ছক সাজিয়েছিল। অপর অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর জবানবন্দিতে জানায়, হত্যাকাণ্ডের দিন বিকেলে তার বন্ধুই তাকে ডেকে নিয়ে জানায় যে তুহিনের সঙ্গে মিলে মুঠোফোন ছিনিয়ে নিতে অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।
তুহিনের জবানবন্দি থেকে আরও জানা যায়, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতি এলাকার একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানে অপ্রতিম নিজের টিকটক আইডির ঠিকানা দিলে রাতেই তাদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হয়। পরে মুঠোফোনে কথা বলে পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঘটনার দিন বাবার দোকানের ওই কিশোরকেও সাথে রাখতে বলেছিল অপ্রতিম। ছবি তোলার সুযোগকে কাজে লাগিয়েই তাকে পাহাড়ের নির্জন গহিনে নিয়ে যাওয়া হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্রের সঙ্গে তার চেয়ে পাঁচ থেকে দশ বছরের বড় যুবকদের মেলামেশা ও সামাজিক মাধ্যমে এমন সম্পর্ক ছিল চরম একটি অসম বন্ধুত্ব। কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন এবং অপর দুই কিশোরকে গ্রেপ্তারের পর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করলে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন