এপ্রিল ১৯, ২০২৬, ১১:০৪ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজারে বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান বিষয়ক সংস্থা অটেক্সার (OTEXA) সাম্প্রতিক তথ্যে এই উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে।
রফতানিকারকরা বলছেন, মার্কিন শুল্ক নীতির কারণে চীন ও ভারতের মতো বড় দেশগুলোর রফতানি কমলেও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অটেক্সার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৩৭ কোটি ডলার মূল্যের পোশাক আমদানি করেছে। এই অঙ্কটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অন্তত ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কম। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পণ্য আমদানির পরিমাণও প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ কমে ১১৭০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া এই মন্দার মধ্যেও যথাক্রমে ৩ শতাংশ ও ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।দেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ক্রয়াদেশগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। নেক্সাস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. রশিদ আহমেদ হোসাইনী এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি জানান, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সরকার যেখানে রফতানি বাড়াতে যুগোপযোগী এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে নীতিগত পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত মন্থর। আইনি ও নীতিগত জটিলতা নিরসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশ।উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পাশাপাশি টানা ছুটি ও বন্দর জটকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু মনে করেন, একক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সোর্সিং বা পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি। তিনি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সোলার এনার্জিতে বিনিয়োগ করার ওপর জোর দেন। তার মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আগামীর অনিশ্চয়তা।
অর্থনীতিবিদরা এই সংকটময় মুহূর্তে রফতানি খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত রফতানিমুখী শিল্পের জন্য একটি বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ চালু করা। এর মধ্যে স্বল্প সুদে ঋণ বা সফট লোন এবং প্রয়োজনে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের মতো সুবিধা থাকতে হবে। বৈশ্বিক বাধার মুখে অভ্যন্তরীণ সহায়তা না বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে রফতানি হিস্যা হারানো ঝুঁকি তৈরি হবে।
উল্লেখ্য যে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে। একদিকে ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচন নীতি, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান জাহাজ ভাড়া ও লজিস্টিক খরচ সব মিলিয়ে এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের পোশাক খাত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নীতিগত সহায়তা ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের শীর্ষস্থান ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন