সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১২:১২ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বহুমুখী প্রভাবে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সমন্বয় এনেছে সরকার। বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং পুঞ্জীভূত আর্থিক ক্ষতি কমাতে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। কয়েক মাস আগেও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের উপরে উঠলেও তখন দেশীয় বাজারে এতটা দাম বাড়ানো হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সামগ্রিক অস্থিরতার কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর করা হয়েছে। সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গত মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য ও সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করে দীর্ঘদিন সেই অনুপাতে দাম বাড়ায়নি সরকার। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে নতুন মূল্য নির্ধারণের দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর সামান্য কমলেও সরকারের সিদ্ধান্তটি কেবল এক দিনের মূল্যের ওপর নির্ভর করেনি। কয়েক মাসের গড় আমদানি ব্যয়, যুদ্ধকালীন পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং বিপিসির পুঞ্জীভূত আর্থিক বোঝাকে এখানে মুখ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতার মূলে রয়েছে জটিল ভূরাজনৈতিক সংকট।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের চলমান সংঘাতে রাশিয়ার বিভিন্ন শোধনাগার এবং জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিশোধিত তেলের সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলোতে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনার ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। এর পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প পথের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, দুটি প্রধান যুদ্ধ বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল, ডিজেল এবং বাণিজ্যিক জাহাজের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে পরিবহন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য তা মারাত্মক আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির পুঞ্জীভূত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
আমদানির বাড়তি খরচ এবং এই বিপুল পরিমাণ ঋণাত্মক ভারসাম্য সামাল দিতেই অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম সমন্বয়ের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। নতুন নির্ধারিত দর অনুযায়ী ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে জ্বালানির মূল্যের তুলনামূলক হিসাব তুলে ধরেছে জ্বালানি বিভাগ।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ভারতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম দেশীয় মুদ্রায় ১৩৪ দশমিক ৭৬ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪ দশমিক ৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১ দশমিক ২৪ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ দশমিক ৪২ টাকা। থাইল্যান্ডে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৫১ দশমিক ২২ টাকায়, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকায়, মালদ্বীপে ১৪০ দশমিক ৭১ টাকায়, ফিলিপাইনে ১৬৮ দশমিক ৫৩ টাকায়, পাকিস্তানে ১৮৫ দশমিক ৪৮ টাকায় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ দশমিক ৭৯ টাকায়। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে তেল পাচারের প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাজারে যুদ্ধের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি অব্যাহত রেখেছে সরকার। তবে জাতীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী সচল রাখা এবং সীমান্তপথে পাচার রোধে জ্বালানির দর সমন্বয় ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারদরের বিপরীতে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান হচ্ছিল প্রায় ৮৯ টাকা।
এর ফলে কেবল ডিজেলেই প্রতিদিন সংস্থাটির লোকসান দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। এই ধারা অব্যাহত থাকলে শুধুমাত্র ডিজেল খাত থেকেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। নতুন করে লিটারে ২০ টাকা সমন্বয় করায় বছরে বিপিসির ক্ষতি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। সে সময় কেরোসিনে ১৮ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা এবং অকটেনে ২০ টাকা বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনে আরও ৫ টাকা করে দাম বাড়ে। জুলাই ও আগস্ট পেরিয়ে সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এই দর বহাল ছিল।
দেশে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে অবশ্য ক্ষণিকের ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে ক্ষয়ক্ষতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বহাল থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থিতিশীল থাকায় অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা নিম্নমুখী হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ১০২ দশমিক ১৫ ডলারে নামে। একই সাথে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে দাঁড়ায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এক দিনের সাময়িক ওঠানামা এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি ব্যয়ের বাস্তব হিসাব এক নয়। সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাময়িকভাবে তেল রপ্তানি বাড়ানোয় বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট সাময়িক কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার দীর্ঘমেয়াদে চরম অস্থিরতায় পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন