বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
খাঁটি খেজুর গুড়

চুয়াডাঙ্গার কলস গুড়: আড়াই হাজার টনের অর্থনৈতিক বিপ্লব

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

চুয়াডাঙ্গার কলস গুড়: আড়াই হাজার টনের অর্থনৈতিক বিপ্লব

শীতের আগমনী বার্তার সাথে সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গায় শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস সংগ্রহ ও সুস্বাদু গুড় তৈরির মহা কর্মযজ্ঞ। জেলার প্রায় আড়াই লাখ খেজুর গাছ থেকে প্রতি বছর উৎপাদিত হয় প্রায় আড়াই হাজার টন খাঁটি গুড়। সুস্বাদু ও ঘ্রাণসমৃদ্ধ খেজুর গুড় উৎপাদনে সারা দেশে প্রথম স্থান দখল করে আছে এই জেলা।

চুয়াডাঙ্গার উর্বর মাটি ও বিশেষ আবহাওয়া খেজুর গাছের অনুকূল। অন্য এলাকার তুলনায় এখানকার গাছ থেকে বেশি পরিমাণ রস পাওয়া যায়। প্রতিটি গাছ থেকে পুরো শীত মৌসুমে যে রস মেলে, তা প্রক্রিয়াজাত করে গড়ে ১০ থেকে ১২ কেজি গুড় তৈরি করা সম্ভব। শীতের সকালে গাছিরা লম্বা বাঁশের লগির সাহায্যে অভিনব কায়দায় গাছ থেকে রসের ভার নামিয়ে আনেন। সংগৃহীত কাঁচা রসের সামান্য অংশ পানীয় হিসেবে সরাসরি বিক্রি হলেও সিংহভাগই ব্যবহৃত হয় ঐতিহ্যবাহী কলস গুড় তৈরিতে। জেলাজুড়ে কয়েক হাজার পরিবার এই রস ও গুড় উৎপাদনের সাথে সরাসরি জড়িত।

গুড় তৈরির জন্য চুলার বিশেষ গঠন ও কৌশল প্রচলিত রয়েছে। রস জ্বাল দেওয়ার বিশেষ মাটির চুলাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় বাইন। এই বাইনের দুই পাশে দুটি পথ থাকে—একপাশ দিয়ে লাকড়ি, খেজুর পাতা ও আখের ছোবড়া জ্বালানি হিসেবে দেওয়া হয় এবং অন্য পাশ দিয়ে ছাই বের করা হয়। রস জ্বাল দেওয়ার বিশেষ চৌকো টিনের পাত্রটিকে বলা হয় জ্বালাড়ি। প্রায় দুই ঘণ্টা একটানা জ্বাল দিয়ে উটকিমালা দিয়ে নাড়তে নাড়তে রস ঘন ও লালচে হয়ে এলে তা নামানো হয়। এরপর কিছুটা ঘন রস আলাদা করে ঘষে ঘষে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সাদা ক্রিমের মতো তৈরি করা হয়, যাকে বলা হয় বীজমারা। এই বীজমারার মানের ওপরই নির্ভর করে গুড় কতটা নিখুঁতভাবে দানাদার ও জমাট হবে। বীজমারা সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে মাটির কলসাকৃতির বিশেষ পাত্রে ঢালা হয়।

এই বিশেষ মাটির পাত্রকে স্থানীয় ভাষায় ভার বলা হয়। কলস আকৃতির পাত্রে বাজারজাত করার কারণে এটি কলস গুড় এবং চমৎকার দানাদার গঠনের কারণে দানা গুড় নামে সর্বত্র সমাদৃত। প্রতিটি মাটির ভারে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ কেজি গুড় ধরে।

দেশের সবচেয়ে বড় খেজুর গুড়ের হাট বসে চুয়াডাঙ্গা সদরের সরোজগঞ্জে। শীতের মৌসুমে সপ্তাহে দুই দিন—সোম ও শুক্রবার সরোজগঞ্জে এই জমজমাট হাট বসে। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে বাইসাইকেল ও অন্যান্য বাহনে করে গাছিরা হাজার হাজার গুড়ের কলস নিয়ে এখানে হাজির হন। পাইকাররা কাঠি দিয়ে গুড়ের ঘনত্ব, গাঢ় লালচে রঙ ও ঘ্রাণ পরখ করে মান যাচাই করেন। প্রতিটি ভারের ওজন ও গুণমানের ওপর নির্ভর করে দরাদরি শেষে ৯০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় গুড় বিক্রি হয়। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হয় গড়ে প্রায় ১০০ টাকার আশপাশে।

প্রতিটি হাটে গড়ে প্রায় কোটি টাকার গুড় লেনদেন হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন মোকাম থেকে পাইকাররা ট্রাকে করে গুড় কিনে নিয়ে যান। পরিবহনের সময় মাটির ভারগুলো যেন ভেঙে না যায়, সেজন্য মুখগুলো কাগজ ও পলিথিনে মুড়ে খড় ঠুসে দিয়ে বিশেষ বিড়ার ওপর নিপুণভাবে স্তরে স্তরে সাজানো হয়। এই হাটে একই সঙ্গে স্থানীয় কুমারদের তৈরি নতুন মাটির ভারও ব্যাপক হারে বেচাকেনা হয়।