রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

চীন এবার কাঁঠাল-পেয়ারা নেবে বাংলাদেশ থেকে

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৬:২৯ পিএম

চীন এবার কাঁঠাল-পেয়ারা নেবে বাংলাদেশ থেকে

ছবি - সংগৃহীত

বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বার্তা নিয়ে এসেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশ থেকে সফলভাবে কাঁচা আম আমদানির পর চীন এখন এদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় দুটি ফল—জাতীয় ফল কাঁঠাল এবং পেয়ারা—আমদানির জন্য জোরালোভাবে কাজ করছে।

এই পদক্ষেপ সফল হলে তা বাংলাদেশের ফল চাষী এবং রপ্তানিকারকদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে এবং চীনের বিশাল বাজারে দেশের কৃষিপণ্যের প্রবেশাধিকার আরও প্রসারিত করবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ-চীন গ্রিন টেক্সটাইল এক্সপো-২০২৫’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত এই সুসংবাদ দেন।

রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, চীনের বাজারে ধীরে ধীরে উন্নতমানের বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের প্রবেশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশি কাঁচা আমের প্রথম চালান অত্যন্ত সফলভাবে চীনে রপ্তানি করা হয়েছিল। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বেইজিং এখন বাংলাদেশের কাঁঠাল ও পেয়ারার জন্য চীনের বাজার উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে।

উল্লেখ্য, আম রপ্তানির আগে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে ফাইটোস্যানিটারি বা উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত শর্তাবলী নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কাঁঠাল ও পেয়ারার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ফল দুটি চীনে রপ্তানি শুরু হলে তা বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং দেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে সহায়ক হবে।

অনুষ্ঠানে দুই দেশের মধ্যেকার শক্তিশালী ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের চিত্রও তুলে ধরেন চীনা রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, চীন টানা পনের বছর ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতারই প্রমাণ।

শুধু বাণিজ্য নয়, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। রাষ্ট্রদূত জানান, গত বছরের আগস্ট মাস থেকে এখন পর্যন্ত ২০টিরও বেশি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই বিপুল বিনিয়োগ বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি এবং উৎপাদন খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি জানান, চীন ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশি করযোগ্য প্রায় সকল পণ্যের (শতভাগের বেশি) জন্য শূন্য-শুল্ক সুবিধা অব্যাহত রেখেছে। এই সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করে দিয়েছে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। রাষ্ট্রদূত মনে করেন, এই শুল্কমুক্ত সুবিধা উভয় দেশের পারস্পরিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতি বেইজিংয়ের দৃঢ় প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন।

টেক্সটাইল এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বস্ত্র শিল্পে সবুজ রূপান্তর অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। চীন এই সবুজ রূপান্তর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তিনি জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি স্থানান্তর

 

পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধিতে সহায়তা এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি একটি টেকসই সবুজ শিল্প শৃঙ্খল গড়ে তোলার জন্য টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল প্রিন্টিং এবং স্মার্ট উৎপাদন বা অটোমেশনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আগামী ২০২৫ সাল চীন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০তম বার্ষিকী হিসেবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর হতে চলেছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব সবসময়ই পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। তিনি প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ (জিজিআই)-এর কথাও উল্লেখ করেন, যা সার্বভৌম সমতা, আন্তর্জাতিক আইন, বহুপাক্ষিকতা এবং জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়নের মতো নীতিগুলোকে সমর্থন করে।

চীন বিশ্বাস করে যে, এই উদ্যোগটি বিশ্বব্যাপী ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির প্রচেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।স্যাভর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড আয়োজিত তিন দিনের এই ‘বাংলাদেশ-চীন গ্রিন টেক্সটাইল এক্সপো-২০২৫’ প্রদর্শনীটি বাংলাদেশে চাইনিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন (সিইএবি)-এর উদ্যোগে যৌথভাবে আয়োজিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং সাংহাই জলবায়ু সপ্তাহ এই আয়োজনের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে রয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশন (বিটিএমসি)-এর চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস. এম. জাহিদ হাসান, বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিআই)-এর সভাপতি খোরশেদ আলম, সিইএবি’র সভাপতি হান কুন এবং বস্ত্র খাতের অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। তবে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাষ্ট্রদূতের দেওয়া কাঁঠাল ও পেয়ারা আমদানির সম্ভাবনার খবরটি, যা বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের হাতছানি দিচ্ছে।