বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬,

আয়ের ৯০ শতাংশ দান করতেন নানা পাটেকর কৃষকদের পাশে থাকার বিরল গল্প

বিনোদন ডেস্ক

অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০১:২৯ পিএম

আয়ের ৯০ শতাংশ দান করতেন নানা পাটেকর কৃষকদের পাশে থাকার বিরল গল্প

ছবি: সংগৃহীত

আয়ের ৯০ শতাংশ দান করতেন নানা পাটেকর—চলচ্চিত্রের আলো ঝলমলে দুনিয়ায় কোটি কোটি টাকা পারিশ্রমিক পাওয়ার পরও এমন বিরল নজির স্থাপন করেছিলেন সদ্য প্রয়াত এই কিংবদন্তি অভিনেতা। প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে বলিউডে নিজের অনন্য অবস্থান তৈরি করার পাশাপাশি স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব, চরম সাদাসিধে জীবনযাপন এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি আলাদা পরিচিতি পেয়েছিলেন। বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিলাসী জীবনের মোহ তাকে কখনোই টানেনি।

নানা পাটেকরের ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল নিজের নীতি ও সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা। কোনো কাজে আপস না করা এবং অকপটে নিজের মতামত প্রকাশের কারণে ক্যারিয়ারজুড়ে একাধিকবার বিতর্কে জড়িয়েছেন তিনি।

পরিচালক ও প্রযোজকদের সাথে মতভেদের বহু ঘটনা ঘটেছে তার দীর্ঘ কর্মজীবনে। এমনকি নিজস্ব জেদ ও আত্মমর্যাদাবোধের কারণে অনেক বড় বড় প্রজেক্ট তার হাতছাড়া হয়ে গেছে। তবে এসব নিয়ে তাকে কোনো দিন আক্ষেপ করতে দেখা যায়নি। শুরুর দিকেই অভিনয় দক্ষতার গুণে প্রথম সারির অভিনেতাদের তালিকায় নিজের নাম লিখিয়েছিলেন নানা। চাইলেই অন্যান্য বলিউড সুপারস্টারদের মতো বিলাসবহুল প্রাসাদ ও চাকচিক্যময় জীবন বেছে নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি হেঁটেছেন ঠিক উল্টো পথে। তার পোশাক, বাসস্থান এবং দৈনন্দিন আচরণে তারকাসুলভ অহংবোধের লেশমাত্র ছিল না।

অসহায় মানুষের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য পথিকৃৎ।

বিশেষ করে ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের খরাপ্রবণ অঞ্চলের চরম অভাবগ্রস্ত কৃষক ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ২০১৫ সালে অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সাথে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি কৃষকদের নগদ সহায়তার পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ, খাল খনন ও গ্রামোন্নয়নসহ নানা টেকসই জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনা করে আসছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, তিনি নিজের মোট উপার্জনের প্রায় ৯০ শতাংশই নিঃস্বার্থভাবে দান করে দিতেন। বিশেষ করে খরা ও ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করা কৃষকদের বিধবা স্ত্রী ও সন্তানদের আর্থিক পুনর্বাসনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোটি কোটি রুপি ব্যয় করেছেন। ২০১৫ সালে বিদর্ভ, লাতুর ও ওসমানাবাদ এলাকার দুর্গত কৃষক পরিবারের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়ার নজির রয়েছে তার। এছাড়া ‘পাঠশালা’ সিনেমায় অভিনয়ের সম্পূর্ণ পারিশ্রমিক তিনি পাঁচটি পৃথক দাতব্য সংস্থাকে এককালীন অনুদান হিসেবে দিয়ে দিয়েছিলেন।

সম্পদের পাহাড় গড়ার চেয়ে মাটির কাছাকাছি থাকাই ছিল তার আনন্দ।

বলিউডের শীর্ষ তারকা থাকা অবস্থাতেও মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে মাত্র ৭৫০ বর্গফুটের একটি সাধারণ এক বেডরুমের ফ্ল্যাটে কয়েক দশক কাটিয়েছেন তিনি। জানা যায়, ফ্ল্যাটটি বহুকাল আগে মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার রুপিতে তিনি কিনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে শত কোটি রুপির মালিক হয়েও কোনো বিলাসবহুল বাংলোয় না গিয়ে ওই সাধারণ ফ্ল্যাটেই দিন কাটিয়েছেন।

প্রকৃতির প্রতিও তার টান ছিল গভীর। পুনের কাছে খাডাকওয়াসলায় ছিল তার প্রায় ২৭ একরের এক গ্রামীণ খামারবাড়ি। সেখানে অবসরের চেয়ে কৃষিকাজে ঘাম ঝরাতেই বেশি পছন্দ করতেন নানা। ধান, গম, পেঁয়াজ ও রসুন চাষ করতেন নিজের হাতে। খামারবাড়ি থেকে উৎপাদিত ফসলের বিক্রয়লব্ধ অর্থ স্থানীয় দরিদ্র কৃষক ও খামার শ্রমিকদের সহায়তায় বিলিয়ে দিতেন তিনি।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে মুম্বাই ও পুনের পাশাপাশি গোয়ার ডোনা পাউলার বাড়িতেও সময় ভাগ করে নিতেন। তবে পুনের খামারবাড়িতে কৃষিকাজে যুক্ত থাকাই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ। গত ৮ অক্টোবর গোয়ার ডোনা পাউলার বাসভবনেই আকস্মিক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জীবনের শেষ ভাগে তিনি প্রতি প্রকল্পে প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিতেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের আনুমানিক হিসাবে তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০ থেকে ৮০ কোটি রুপির কাছাকাছি ধরা হলেও তিনি গাড়ির পেছনে কখনো অর্থ অপচয় করেননি। গ্যারেজে রাখা তিন থেকে চারটি সাধারণ গাড়ির বাইরে একবার ১ কোটি ৫০ লাখ রুপির একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার সুযোগ পেয়েও তা ফিরিয়ে দেন এবং সেই অর্থ ব্যয় করেন অভাবী কৃষকদের ত্রাণ তহবিলে।

তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একাধিক ফিল্মফেয়ার এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ লাভ করা এই মহান শিল্পী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চলচ্চিত্রের বাইরের সাধারণ মানুষ, মাটি ও কৃষকদের আপন করে নিয়েছিলেন।