রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সন্তানের জন্মের আগেই বদলে যায় বাবার শরীর ও মন

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

জুন ২১, ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

সন্তানের জন্মের আগেই বদলে যায় বাবার শরীর ও মন

সন্তানের জন্মের আগে থেকেই পুরুষদের শরীরে হরমোনজনিত বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটে যা তাদের আচরণকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এই পরিবর্তনের সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে তাদের ভবিষ্যৎ সন্তানের সামগ্রিক সুস্থতার ওপর। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের বিভিন্ন আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে পিতৃত্ব একজন পুরুষকে মানসিকভাবে এমনভাবে পরিবর্তিত করে যা মাতৃত্বের রূপান্তরের মতোই গভীর। একজন বাবা তার সন্তানের যত্নে যত বেশি সম্পৃক্ত হন এই জৈবিক রূপান্তর তত বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে ওঠে।

পুরুষদের এন্ডোক্রাইন বা হরমোন এবং স্নায়ুতন্ত্রের এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে যত্নশীল বাবা হওয়া কোনো আধুনিক সাংস্কৃতিক ব্যতিক্রম নয় বরং এটি পুরুষের একটি সুপ্ত জৈবিক বৈশিষ্ট্য।বিশ শতকের শেষের দিকে প্রাণীদের ওপর করা প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে যে অনেক স্তন্যপায়ী পুরুষ যখন সন্তানের যত্ন নেয় তখন তাদের শরীরে টেস্টোস্টেরন, ভ্যাসোপ্রেসিন ও প্রোল্যাকটিনের মতো হরমোনের ওঠানামা ঘটে। মানুষের ক্ষেত্রে এই ধারণার সত্যতা খুঁজতে ফিলিপাইনের সেবু সিটিতে কয়েক দশক ধরে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প চালানো হয়। 

২০০৫ সালে সেখানে ৬২৪ জন সঙ্গীহীন তরুণের লালার নমুনা সংগ্রহ করে চার বছর পর আবার পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে যারা অন্তর্বর্তী সময়ে বাবা হয়েছেন এবং শিশুদের দেখভালে বেশি সময় কাটিয়েছেন তাদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এমনকি যারা সন্তানদের সাথে একই বিছানায় ঘুমান তাদের শরীরেও এই হরমোনের মাত্রা অনেক কম পাওয়া গেছে যা তাদের শিশুর কান্নার প্রতি আরও সতর্ক ও স্পর্শকাতর করে তোলে।

হরমোনের এই পরিবর্তন শুধু টেস্টোস্টেরনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং ভালোবাসার হরমোন নামে পরিচিত অক্সিটোসিনের মাত্রাও নতুন বাবাদের শরীরে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে বাবারা যখন প্রথমবার তাদের নবজাতক শিশুকে কোলে নেন বা কাছাকাছি থেকে খেলাধুলা করেন তখন তাদের শরীরে অক্সিটোসিনের এক বিশাল ঢেউ তৈরি হয়। আবার ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে পুরুষদের মধ্যে আধিপত্য বা বিবাদের অনুভূতি প্রকাশকারী ভ্যাসোপ্রেসিন হরমোনের পরিমাণ শিশুর জন্মের চার মাস আগেই কমে যায়। 

অন্যদিকে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে যেসব হবু বাবা অনাগত সন্তানের সাথে সুদৃঢ় মানসিক বন্ধন অনুভব করেন তাদের শরীরে প্রোল্যাকটিন হরমোনের মাত্রা অনেক বেশি থাকে।হরমোনজনিত এই পরিবর্তনের পাশাপাশি পিতৃত্বের জৈবিক পরিবর্তন পুরুষদের মস্তিষ্কেও এক স্থায়ী গভীর ছাপ ফেলে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীদের একটি দল প্রথমবার বাবা হওয়া পুরুষদের সন্তান জন্মের আগে এবং পরে নিয়মিত মস্তিষ্ক স্ক্যান করেন। এতে দেখা গেছে নতুন অভিজ্ঞতা ও তথ্যের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য পুরুষদের স্নায়বিক গঠন সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করছে যা মানুষের কৈশোরকালীন বিকাশের মতোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

২০১৪ সালে ইসরায়েলে সমকামী ও বিষমকামী বাবাদের ওপর করা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা শিশুর প্রাথমিক যত্ন নেন তাদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা বা মাতৃসুলভ অনুভূতির অঞ্চলগুলো সমভাবে উদ্দীপিত হয়।বিজ্ঞানীদের এই সমস্ত অনুসন্ধান প্রমাণ করে যে মানব মস্তিষ্কে সন্তান লালন-পালনের একটি প্রাক-বিবর্তিত সুপ্ত ক্ষমতা রয়েছে যা সঠিক পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।এই গভীর জৈবিক বিকাশের কারণে বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা এখন সরকারি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পিতৃত্বকালীন ছুটি চালু এবং গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই পুরুষদের আল্ট্রাসাউন্ড বা চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণে সম্পৃক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছেন। 

পাকিস্তান, কেনিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে করা গবেষণায় দেখা গেছে যেসব মায়েদের সঙ্গীরা বেশি সক্রিয় থাকেন তাদের মানসিক স্বাস্থ্য অনেক উন্নত থাকে। এছাড়া ২০২৬ সালের শুরুতে সাত বছর ধরে ২৯২টি পরিবারের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে যে যেসব বাবা সন্তান লালনপালনে অধিক মনোযোগী তাদের সন্তানদের হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য দীর্ঘমেয়াদে অনেক ভালো থাকে।