বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬,

সিফিলিস কী? এ থেকে বাঁচার উপায়

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম

সিফিলিস কী? এ থেকে বাঁচার উপায়

ছবি: সংগৃহীত

সিফিলিস একটি মারাত্মক যৌনবাহিত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, এই রোগের জন্য দায়ী প্রধান জীবাণুর নাম ট্রেপনোমা প্যালিডাম (Treponema pallidum)। অসুরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এবং সিফিলিসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে এই রোগটি মানবদেহে ছড়ায়।

তবে কেবল শারীরিক সংসর্গই নয়, আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমেও অন্য কেউ এই ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত হতে পারেন। এছাড়া কোনো নারী গর্ভাবস্থায় সিফিলিসে আক্রান্ত থাকলে গর্ভস্থ সন্তানের মধ্যেও এই সংক্রমণ সরাসরি ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। যারা প্রায়ই বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন এবং ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গীর সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়ান, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে।

সাধারণত সংক্রমিত কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে।

তবে কারও কারও ক্ষেত্রে এই জীবাণু সুপ্ত অবস্থায় থেকে লক্ষণ প্রকাশ পেতে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সিফিলিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উপসর্গের ধরনে ভিন্নতা দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শরীরের প্রবেশপথে ব্যথাহীন ক্ষতের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢোকে। পরবর্তী সময়ে সারাদেহে ব্রণের মতো গুটি দেখা দিতে পারে, যা আকারে ক্রমশ বড় হয়ে কখনো কখনো এক সেন্টিমিটার পর্যন্ত রূপ নেয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত জননাঙ্গে এই ক্ষত বা আলসার ধরা পড়ে এবং নারীদের ক্ষেত্রে তা দৃশ্যমান হয় যোনিপথে। এছাড়া নারী ও পুরুষ উভয়ের মলদ্বার বা পায়ুপথ সংলগ্ন এলাকায় এমন ক্ষত তৈরি হতে পারে।

অনেকের ক্ষেত্রে ঠোঁট ও জিহ্বায় এমনকি আঙুলেও ব্যাকটেরিয়ার এই সংক্রমণ ঘটতে পারে, যা সিফিলিস সংক্রমণের প্রথম পর্যায় নির্দেশ করে।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই উপসর্গগুলো অনেক সময় সুস্পষ্ট কষ্ট তৈরি করে না বলে অনেকেই একে অবহেলা করেন এবং চিকিৎসকের কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। প্রায় তিন সপ্তাহ পার হলে কোনো ওষুধ গ্রহণ ছাড়াই এই আলসার বা ক্ষত প্রাকৃতিকভাবে শুকিয়ে যেতে পারে। তবে ক্ষত শুকিয়ে যাওয়া মানে রোগমুক্তি নয়; বরং জীবাণু তখন রক্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। এ সময় পুরো শরীরে লালচে, গোলাপি কিংবা পোড়া ক্ষতের মতো ফোসকা বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। হাতের তালুতেও এই ফোসকা ছড়িয়ে পড়ে, তবে সাধারণ অ্যালার্জির মতো এতে কোনো চুলকানি থাকে না।

রোগের তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছে ব্যাকটেরিয়া শরীরের প্রধান অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোতে সরাসরি আঘাত হানে। এ সময় মানুষের শ্বাসতন্ত্র, পাকস্থলী, যকৃত, মাংসপেশি এবং হাড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন সিফিলিস রক্ত সংবহনকারী প্রধান ধমনি বা আর্টারিকে আক্রান্ত করে, যার ফলে রোগীর আকস্মিক মৃত্যুও হতে পারে।

চতুর্থ বা চূড়ান্ত ধাপে এসে এই সংক্রমণ সারা শরীরে স্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনে। এর ফলে হৃদযন্ত্রে তীব্র প্রদাহ তৈরি হয় এবং যকৃতের কার্যক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

একই সঙ্গে মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতা বদলে গিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা ও আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে। এই পর্যায়ে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়া, জটিল স্নায়ুবিক ক্ষতিসাধন এবং শরীরের নির্দিষ্ট অংশ পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা অবশ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।

সিফিলিসের মতো সংবেদনশীল ও প্রাণঘাতী শারীরিক সমস্যা নিয়ে সমাজে এখনো গভীর কুসংস্কার ও সামাজিক ট্যাবু বিদ্যমান রয়েছে। যৌন মিলনের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়—এমন তথ্যের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রায়ই সামাজিকভাবে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়। এই মানসিক চাপের কারণে ভুক্তভোগীরা রোগটি গোপন রাখার চেষ্টা করেন, যার ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে এই রোগ প্রতিরোধে সার্বিক সচেতনতা ও প্রাথমিক অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণই রোগ থেকে মুক্তির প্রধানতম চাবিকাঠি।