মার্চ ৫, ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, যা মূলত পাঁচটি প্রধান চাপের মাধ্যমে দৃশ্যমান হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশে গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি সেচ, শিপিং ব্যয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে, যার একটি বিশাল অংশ আসে কাতার ও ওমান থেকে। এই জাহাজ চলাচলের প্রধান পথই হলো হরমুজ প্রণালি, যা এখন যুদ্ধের কারণে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো না এলে দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেবে। এর ফলে দেশের গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে উৎপাদনমুখী শিল্পখাতেও, বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর পোশাক কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। এলএনজির পাশাপাশি অপরিশোধিত তেল সরবরাহেও নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে, যা এই নৌপথ ব্যবহার করেই পরিবাহিত হয়। ইতোমধ্যে সৌদি আরবের তেল টার্মিনালে হামলার ঘটনায় সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধাক্কা লেগেছে।
কৃষি খাতেও এই সংকটের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। বর্তমানে দেশে বোরো ধান চাষের মৌসুম চলছে, যেখানে সেচ কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেল ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে যদি সেচ ব্যাহত হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর ঝুঁকি তৈরি করবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে, কারণ বিশ্বের একটি বড় অংশের ইউরিয়া সার হরমুজ রুট দিয়েই পরিবাহিত হয়।
ডিজেল ও সারের দাম একযোগে বাড়লে চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এখন বিকল্প পথ হিসেবে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ব্যবহার করছে, যার ফলে পণ্য পরিবহনের সময় এবং ব্যয় দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।শিপিং কোম্পানিগুলোর এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সয়াবিন তেলসহ আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বর্তমানে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির মজুদ নিয়ে আশ্বস্ত করলেও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধাবস্থা সামাল দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সম্ভাব্য বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন