মে ১৫, ২০২৬, ০৪:২০ পিএম
আটলান্টিক মহাসাগরের এক দীর্ঘস্থায়ী রহস্যের জট খুলেছেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। ৩ কোটি বছরের বেশি সময় ধরে বারমুডার আগ্নেয়গিরিগুলো নিষ্ক্রিয় থাকলেও দ্বীপটি কেন আশপাশের সমুদ্রতলের চেয়ে উঁচুতে, তা নিয়ে ভূতত্ত্ববিদদের মধ্যে দীর্ঘকাল সংশয় ছিল। কার্নেগি সায়েন্সের ভূকম্পবিদ উইলিয়াম ফ্রেজার এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জেফ্রি পার্কের নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় অবশেষে এর উত্তর মিলেছে।
বিজ্ঞানীদের দাবি, বারমুডা এমন এক ধরনের বিশেষ ভূতাত্ত্বিক গঠনের ওপর অবস্থান করছে যা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায়নি।দ্বীপটির গভীর ভূগর্ভেই এই রহস্যের মূল সূত্র লুকিয়ে আছে।
হাওয়াইয়ের মতো অধিকাংশ আগ্নেয় দ্বীপমালা সাধারণত `ম্যান্টল প্লুম` বা উত্তপ্ত শিলাস্তম্ভের ওপর গঠিত হয়। এটি হলো পৃথিবীর গভীর ম্যান্টল থেকে উঠে আসা উত্তপ্ত শিলার একটি স্তম্ভ। এই গরম পদার্থ যখন উপরের দিকে ধাক্কা দেয়, তখন আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয় এবং সমুদ্রতল ফুলে ওঠে। সাধারণত আগ্নেয় কার্যকলাপ কমে এলে এবং টেকটোনিক প্লেটগুলো প্লুম থেকে দূরে সরে গেলে এই স্ফীত অংশগুলো আবার নিচে নেমে যায়।
কিন্তু বারমুডার ক্ষেত্রে কয়েক কোটি বছর পার হলেও এমনটি ঘটেনি।কার্নেগি সায়েন্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বারমুডা এখনও আশপাশের সমুদ্রতলের চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ ফুট উঁচুতে অবস্থান করছে। এই রহস্য অনুসন্ধানে গবেষকরা বড় বড় ভূমিকম্প থেকে তৈরি হওয়া ভূকম্পীয় তরঙ্গ ব্যবহার করেছেন। এই তরঙ্গগুলো পৃথিবীর অভ্যন্তরের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সেগুলোর ঘনত্ব ও গঠনের ওপর ভিত্তি করে তাদের গতি পরিবর্তন করে। বারমুডার একটি ভূকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দ্বীপের ২০ মাইল গভীর পর্যন্ত একটি নিখুঁত চিত্র তৈরি করতে সক্ষম হন। সমুদ্রীয় ভূত্বকের নিচে ১২ মাইলেরও বেশি পুরু একটি অস্বাভাবিক শিলাস্তর খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই শিলাস্তরটির ঘনত্ব আশপাশের ম্যান্টলের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে এটি সমুদ্রের নিচে একটি বিশালাকার ভেলার মতো কাজ করছে, যা পুরো বারমুডা দ্বীপকে ভাসিয়ে রাখতে সহায়তা করছে। ভূতাত্ত্বিক ভাষায় এই প্রক্রিয়াটিকে `আন্ডারপ্লেটিং` বলা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, কোটি কোটি বছর আগে যখন বারমুডায় আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা ছিল, তখন কার্বনসমৃদ্ধ গলিত ম্যান্টল শিলা ভূত্বকের নিচের অংশে প্রবেশ করে সেখানেই ঠান্ডা হয়ে জমাট বেঁধে যায়। এই পদার্থের উৎস সম্ভবত পৃথিবীর গভীরে কয়েকশ কোটি বছর আগের, যখন সুপারমহাদেশ প্যাঞ্জিয়া গঠিত হচ্ছিল।
উইলিয়াম ফ্রেজার জানিয়েছেন, বারমুডা গবেষণার জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি স্থান কারণ এর বৈশিষ্ট্যগুলো প্রচলিত ম্যান্টল প্লুম মডেলের সঙ্গে মেলে না। এখানে যে পরিমাণ পুরু আন্ডারপ্লেটিং স্তর দেখা গেছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো ম্যান্টল প্লুম অঞ্চলে সচরাচর দেখা যায় না। এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পৃথিবীর ম্যান্টলের ভেতরে আরও কিছু অজানা প্রবাহগত প্রক্রিয়া রয়েছে যা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক ভূ-রাসায়নিক পর্যবেক্ষণগুলোও এই নতুন ভূতাত্ত্বিক তত্ত্বকে সমর্থন করছে যা আগামীর গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
এদিকে ফ্লোরিডা, বারমুডা এবং পুয়ের্তো রিকোর মধ্যবর্তী এই অঞ্চলটি জাহাজ ও উড়োজাহাজ নিখোঁজ হওয়ার কারণে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। যদিও প্রচলিত বিভিন্ন লোককথা এসব ঘটনার পেছনে অলৌকিক শক্তির ইঙ্গিত দেয়, তবে বিজ্ঞানীরা একে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে, এই নিখোঁজ রহস্যের মূল কারণ হলো ওই অঞ্চলের অত্যধিক যানচলাচল, গালফ স্ট্রিমের মতো চরম প্রতিকূল আবহাওয়া এবং মানুষের ভুল। আন্তর্জাতিক এই ব্যস্ত সমুদ্রপথে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাই মূলত ঝুঁকির প্রধান উৎস, যার সঙ্গে অলৌকিকতার কোনো সম্পর্ক নেই।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন