রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬,

নারীর স্বাস্থ্যসেবায় ২৫০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করছে বাংলাদেশ ও ইআইবি

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ১১, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম

নারীর স্বাস্থ্যসেবায় ২৫০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করছে বাংলাদেশ ও ইআইবি

নারীর স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ২৫০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি)। ‘উইমেনস হেলথ ইনিশিয়েটিভ’ শীর্ষক এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত মেয়াদে দেশের প্রায় চার কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

শনিবার (১০ অক্টোবর) জার্মানির বার্লিনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘নারী স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবার সহনশীলতা বৃদ্ধি’ বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এই বিনিয়োগ উদ্যোগের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। আলোচনায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।

এই বহুমুখী কর্মসূচির আওতায় দেশজুড়ে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের উন্নত চিকিৎসা এবং জরুরি প্রসূতিসেবার পরিধি ব্যাপক হারে সম্প্রসারণ করা হবে।

একই সঙ্গে তৃণমূলের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল, রোগী স্থানান্তর ও রেফারেল অবকাঠামো এবং হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা আধুনিকায়ন করা হবে। দীর্ঘমেয়াদে মহামারি বা যেকোনো বৈশ্বিক জরুরি স্বাস্থ্য সংকট কার্যকরভাবে মোকাবিলায় এই উদ্যোগ দেশকে টেকসই সক্ষমতা যোগাবে।

সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাংলাদেশের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার রোগ নিরাময়ের চেয়ে রোগ প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি নাগরিকের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, প্রচলিত চিকিৎসানির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থার খোলস ছেড়ে রোগ প্রতিরোধ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যোন্নয়নকেন্দ্রিক আধুনিক ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ঐতিহাসিক মাইলফলক হবে।

ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা সভায় মন্তব্য করেন, নারীর সুস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করলে পরিবার ও সমাজের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং সক্ষমতা বাড়ে, যা টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করে।

পুরো উদ্যোগটি প্রণয়নে বাংলাদেশ সরকারকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল এবং সংস্থাটির উদ্ভাবনী কর্মসূচি ‘উইমেনএক্স কালেকটিভ’। মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সময়ও সংস্থাটি সার্বিক কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে।

ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক দিয়েন কিটা বলেন, উন্নয়নশীল বিশ্বে নারীর স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান অর্থায়ন ঘাটতি পূরণে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী। এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে লাখ লাখ প্রান্তিক নারী ও কিশোরীর প্রজনন ও দৈনন্দিন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

জাতীয় স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) এক শতাংশ থেকে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতের বার্ষিক সরকারি ব্যয় পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশজুড়ে এক লাখ নতুন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই হবেন নারী। এর পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবসেবা জোরদারে ২৫ হাজার দক্ষ পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের প্রক্রিয়াও বিবেচনায় রয়েছে।

কর্মসূচিটির কারিগরি বাস্তবায়নে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল অন্তত ২৫ মিলিয়ন ইউরো সমমূল্যের আন্তর্জাতিক অনুদান সংগ্রহ করছে। এতে জার্মানির ফেডারেল মিনিস্ট্রি ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিএমজেড) ছাড়াও আন্তর্জাতিক বেসরকারি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারেরা অর্থায়ন ও সহায়তা প্রদান করছে।

রোববার (১১ অক্টোবর) বার্লিনে ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট ২০২৬-এর একটি বিশেষ প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ সরকার বিশ্বমঞ্চে এই সমন্বিত উদ্যোগ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর যৌথ মালিকানাধীন ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে জাতিসংঘের প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষায়িত সংস্থা ইউএনএফপিএ বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশ ও ভূখণ্ডে নারী ও কিশোরীদের মৌলিক অধিকার এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করছে। ১৯৭৪ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে সংস্থাটি।