রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬,
গ্রামীণ অর্থনীতি রূপান্তর

মডেল খাল কর্মসূচি শুরু হচ্ছে ৮ বিভাগে: বদলাবে ২৪০০ পরিবারের ভাগ্য

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১১, ২০২৬, ১০:৫৯ এএম

মডেল খাল কর্মসূচি শুরু হচ্ছে ৮ বিভাগে: বদলাবে ২৪০০ পরিবারের ভাগ্য

ছবি: Ai

নদী-নালা, খাল ও জলাশয় পুনঃখননের পর সেগুলোকে কেবল পানি নিষ্কাশনের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আটকে না রেখে পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক বনায়ন, দুর্যোগ-সহনশীল জীবিকায়ন এবং অতিদরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্থায়ী সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

‘শুধু খাল খনন নয়; খননকৃত খালের বহুমুখী ব্যবহার’—এই মূলনীতিকে সামনে রেখে দেশের আটটি বিভাগে ২০টি নির্বাচিত সরকারি খালে পরীক্ষামূলক ‘মডেল খাল’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এই পাইলট প্রকল্পে উপকারভোগী হিসেবে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে সরাসরি যুক্ত করার প্রাথমিক হিসাব প্রস্তুত করা হয়েছে।

আগামী ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লালমনিরহাটে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন বলে মন্ত্রণালয়ের নীতিগত ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্যোগটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশজুড়ে খাল খননের বিপ্লব সূচনা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে চরম অবহেলা ও বেপরোয়া অবৈধ দখলের কারণে অধিকাংশ খাল ভরাট হয়ে যায়।

তিনি জানান, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সংগতি রেখে সরকারের চারটি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে বর্তমানে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় একাই সাত হাজার কিলোমিটার খনন কাজ পরিচালনা করবে। গত অর্থবছরে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার এক হাজার ২০০ কিলোমিটার খননকাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, কেবল পানি নিষ্কাশন নয়; খালের পাড়ে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ, পানিতে হাঁস ও মৎস্য চাষ এবং কুটির শিল্পের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে জলসম্পদের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। এই লক্ষ্যেই মডেল খাল কর্মসূচির রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ধারণাপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নদী-নালা ও খাল পুনঃখননের চলমান কর্মসূচির পাশাপাশি দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে সরকারি এসব জলসম্পদকে পরিকল্পিত ব্যবহারের আওতায় আনা হচ্ছে।

খালের পানি ধারণক্ষমতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখেই এর পাড়ে সামাজিক বনায়ন, হাঁস ও মাছ পালন, মৌসুমি সবজি চাষ, জনসাধারণের বৈধ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, পরিবেশবান্ধব নৌচলাচল এবং অতিদরিদ্র মানুষের টেকসই জীবিকা তৈরি করাই এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য।

সামাজিক সুরক্ষাকে কেবল অনুদান বা ভাতা-নির্ভরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনমুখী কাজের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষকে স্বাবলম্বী করা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে এই কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার আইনগত, প্রশাসনিক ও কারিগরি এখতিয়ার বজায় রেখেই কর্মসূচি পরিচালিত হবে।

দেশের কৃষিজমিতে সেচসুবিধা সম্প্রসারণ, পানিসম্পদ সংরক্ষণ ও খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের কাজ পুরোদমে চলছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’র চেতনায় জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে হারানো নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বেগবান রাখা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পুনঃখনন শেষে তদারকি ও সমন্বিত সামাজিক ব্যবহারের অভাবে খালগুলো যাতে পুনরায় অবৈধ দখলদারদের কবলে না পড়ে কিংবা বর্জ্য ও পলি জমে ভরাট না হয়, সেজন্যই মডেল খাল কর্মসূচি রক্ষা-কবচ হিসেবে কাজ করবে।

এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু মন্তব্য করেন, খালপাড়ের দরিদ্র সুবিধাভোগীরা যখন সরাসরি উৎপাদনের সুফল পাবেন, তখন তারা পরম মমতায় খাল পাহারা দেবেন ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব কর্মচাঞ্চল্য যোগাবে।

প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে আটটি বিভাগের ২০টি নির্বাচিত খালে পাইলটিং পরিচালিত হবে। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে তিনটি করে এবং রংপুর, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে দুটি করে খাল নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিটি খালের গড় দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটার ধরে মোট প্রায় ৬০ কিলোমিটার খালের বহুমুখী ব্যবহারকে পরীক্ষামূলক প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে পূর্বে পুনঃখনন হয়েছে এমন খালকে নির্বিচারে বাছাই করা হবে না। জেলা পর্যায় থেকে পাঠানো প্রস্তাবনাগুলোর মধ্য থেকে ভৌগোলিক জিপিএস স্থানাঙ্ক, জমির খতিয়ান, দখল পরিস্থিতি, পানির প্রবাহ এবং স্থানীয় অধিবাসীদের চাষাবাদের উপযোগিতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে চূড়ান্ত ২০টি খাল চূড়ান্ত করা হবে।

সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় অতিদরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি), নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া পরিবার এবং প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা দরিদ্র পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হবে।

খালের ভৌগোলিক বিন্যাস ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ ‘জোন’ বিন্যাস নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, খালের নির্দিষ্ট অংশ সাধারণ মানুষ ও গবাদিপশুর গোসল এবং গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য ‘পাবলিক জোন’ হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে। খালের তুলনামূলক গভীর ও সুবিধাজনক অংশে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কারিগরি পরামর্শে নিয়ন্ত্রিত হাঁস পালনের জন্য ‘প্রোডাকশন জোন’ করা হবে। নৌযান চলাচলের সুযোগ থাকা খালে নিরবচ্ছিন্ন জলযানের জন্য রাখা হবে ‘ন্যাভিগেশন চ্যানেল’।

মাটি ধস ঠেকাতে খালের দুই পাড়ে জলসহিষ্ণু ও ফলজ গাছের ‘সোশ্যাল ফরেস্ট্রি’ গড়ে তোলা হবে এবং পাড়ের ঢালু জমিতে মাচা পদ্ধতিতে চলবে বিষমুক্ত মৌসুমি সবজির আবাদ।

এই ২০টি খালে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সমবায়ভিত্তিক পরিচালনা কাঠামো গড়ে তোলা হবে, যেখানে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নারী সদস্যের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক থাকবে।

তবে কোনো সমবায় বা ব্যক্তিকে খাল কিংবা সরকারি পাড়ের জমির স্থায়ী মালিকানা প্রদান করা হবে না; কেবল অ-হস্তান্তরযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ ব্যবহারের অনুমতি মিলবে।

কোনো পৃথক মেগা-প্রকল্প গ্রহণ না করে সরকারের বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেই জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রাথমিক বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকার তহবিল প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা কোনো স্থায়ী অনুদান নয় বরং একটি ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে পরিচালিত হবে। সরকারের প্রাথমিক পুঁজিতে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর লভ্যাংশ থেকে সমবায়গুলো নিজস্ব পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করবে, যা সরকারের আর্থিক নির্ভরতা কমিয়ে আনবে।

জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি পুরো কার্যক্রম তদারকি করবে। পাইলট পর্বে ১২ মাস পরিচালনার পর একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে এটি দেশব্যাপী বিস্তৃত করা হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সেখ ফরিদ আহমেদ জানান, মডেল খালের মূল দর্শন হলো গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলোকে নিবন্ধিত সমবায়ের অধীনে সংগঠিত করা। কর্মসূচির প্রথম দুই বছর সরকার সার্বিক আর্থিক অনুদান, উৎপাদনের কাঁচামাল, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও কারিগরি দিকনির্দেশনা দেবে। দুই বছর পর উৎপাদনের পুরো আয় ও অর্জিত সম্পদের মালিকানা সমবায়ের সদস্যদের হাতে ন্যস্ত হবে, যা তাদের সম্পূর্ণভাবে আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে।