শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬,
ব্যাংকিং খাতে সংস্কার

খেলাপি ঋণ আদায়ে ত্রিস্তরীয় পরিকল্পনা: বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর উদ্যোগ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১০, ২০২৬, ০১:৩০ পিএম

খেলাপি ঋণ আদায়ে ত্রিস্তরীয় পরিকল্পনা: বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর উদ্যোগ

দেশের ব্যাংক খাতে পাহাড়সম খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা, আদায় প্রক্রিয়া জোরদার এবং সামগ্রিক আর্থিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফেরানো, আদায়ে গতি বৃদ্ধি এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধের টেকসই সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করতে এই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে উপস্থাপিত এক আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদীয় কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কার্যকর নজরদারির ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী এক বছরের মধ্যে যেসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, তাদের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রতি তিন মাস অন্তর সরাসরি আলোচনায় বসবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এসব বৈঠকে ঋণ পুনরুদ্ধারের মাঠপর্যায়ের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করা হবে এবং তা নিরসনে ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ব্যাংকার্স সভায় প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অগ্রগতি সরাসরি পর্যালোচনা করা হবে।

উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণে আক্রান্ত ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ পুনরুদ্ধার কৌশল নির্দেশিকা তৈরি এবং ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা হালনাগাদ করার কাজ চলছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস-৯) অনুসরণ করে প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি বা ‍‍`এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস‍‍` পদ্ধতিতে ঋণ শ্রেণিকরণ ও নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রোভিশন সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি আগেভাগে নিরূপণ করা সম্ভব হবে। সাধারণ ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশের আইনগত দিকগুলোও এখন নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম জানিয়েছেন, আর্থিক খাতে অন্যায্য ছাড় দেওয়ার চলমান সংস্কৃতি ধাপে ধাপে বন্ধ করতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির আইনি প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করা প্রয়োজন। ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয় পক্ষকেই পারস্পরিক কার্যকর সমাধানের পথ বেছে নিতে প্রণোদনা কাঠামোর আওতায় আনা জরুরি।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ঋণ আদায়ে অনন্য ভূমিকা রাখা ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার নীতি প্রণয়ন করা হবে। এর ফলে আদায় কার্যক্রমে কর্মকর্তাদের সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব ভালো গ্রাহক নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেন, তাদের পুরস্কৃত ও উৎসাহিত করতে বিদ্যমান নীতিমালার আধুনিকায়ন করা হবে।

দীর্ঘমেয়াদে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে আমূল পরিবর্তন আনার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে তদারকি, শ্রেণিকরণ ও আদায়ের প্রতিটি পর্যায়ে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ ঋণখেলাপি হয়ে যাওয়ার পর শুধু আদায় তৎপরতা চালানোর চেয়ে ঋণ বিতরণের শুরুতেই ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

সাম্প্রতিক আর্থিক পরিসংখ্যান এই ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগের প্রান্তিকে, অর্থাৎ গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং খেলাপি ঋণের সামগ্রিক হার বৃদ্ধি পেয়েছে শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।

খেলাপি ঋণের এই বিশাল চাপ সামাল দিতে মাঠপর্যায়ের আদায়ের পাশাপাশি আইনি কাঠামোকে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে ‍‍`ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৬‍‍`-এর খসড়া। গত ২২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত এবং ২৬ এপ্রিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নীতিগত নির্দেশনার আলোকে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়। পরবর্তীতে সংশোধিত খসড়াটি গত ২৪ আগস্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে সর্বশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ২০ সেপ্টেম্বর।

আইনি জটিলতা কাটাতে ‍‍`অর্থঋণ আদালত (সংশোধন) আইন, ২০২৬‍‍` প্রণয়নের কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে এ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে। পূর্বে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বর্তমানে আরেকটি কমিটি সংশোধিত আইনের খসড়া তৈরিতে কাজ করছে।

ব্যাংক খাতের অনাদায়ী সম্পদ পুনরুদ্ধারে প্রস্তুত করা হচ্ছে ‍‍`দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬‍‍`। একই সঙ্গে বিদ্যমান ১৯৯৭ সালের পুরনো দেউলিয়াত্ব আইন বাতিল করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে যুগোপযোগী ‍‍`দেউলিয়াত্ব ও দেউলিয়া কার্যক্রম আইন, ২০২৬‍‍` প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহযোগী সংস্থা আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থার (আইএফসি) কারিগরি সহায়তায় দেউলিয়াত্ব আইনের ইংরেজি খসড়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। খসড়াটির প্রমিত বাংলা অনুবাদের জন্য আইএফসির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। বাংলা সংস্করণ হাতে পাওয়ার পরপরই পরবর্তী আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জন্য তা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হবে। এই সমন্বিত আইনি ও তদারকি সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে আশা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।