শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬,

পঞ্চগড়ে দিনে অর্ধকোটি টাকার জলপাই বিক্রি

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১০, ২০২৬, ১২:৪০ পিএম

পঞ্চগড়ে দিনে অর্ধকোটি টাকার জলপাই বিক্রি

উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবদারুতলায় জমে উঠেছে মৌসুমি জলপাইয়ের বিশাল বাজার। সকালের প্রথম আলো ফোটা থেকে শুরু করে গোধূলিলগ্ন পর্যন্ত ক্ষুদ্র চাষি, পাইকারি ব্যবসায়ী ও দূরদূরান্ত থেকে আসা আড়তদারদের পদচারণায় মুখর থাকছে পুরো চত্বর। এই এক মোকামেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকার জলপাই কেনাবেচা হচ্ছে। ফলটি লাভজনক হওয়ায় অঞ্চলে বাগানের সংখ্যা বাড়ছে, সৃষ্টি হচ্ছে তৃণমূলের কর্মসংস্থান এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত এই দেবদারুতলায় জলপাইয়ের পাশাপাশি জাম্বুরা, কলা, পেঁপেসহ নানা মৌসুমি ফল বিক্রি হয়।

তবে আশ্বিনের শুরু থেকেই এই বাজারের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে সবুজ জলপাই। আকার, গুণগত মান এবং স্বাদের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেবীগঞ্জের জলপাইয়ের বিপুল কদর রয়েছে। প্রতিদিন এখান থেকে শত শত মণ জলপাই সড়ক ও রেলপথের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাব বলছে, প্রতিদিন এই মোকামে ৭০ থেকে ১০০ টন জলপাই কেনাবেচা হচ্ছে। ফলের মানভেদে প্রতি কেজি জলপাই বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৪০ টাকায়। স্থানীয় বাগানগুলো থেকে ফল সংগ্রহ করে বাইরের পাইকারদের কাছে সরবরাহ করছেন প্রায় এক হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

মৌসুমের ফলন পরিপক্ব হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও দূরবর্তী জেলার ব্যবসায়ীরা বাগানমালিকদের আগাম অর্থ দিয়ে বাগান কিনে নেন। ফল পাকার পর নিজস্ব শ্রমিক নামিয়ে গাছ থেকে জলপাই পেড়ে আড়তে তোলা হয়। এর ফলে সাধারণ চাষিদের ফল পাড়া ও বাজারে নেওয়ার পরিবহন ঝুঁকি কমে যায়। একই সঙ্গে এককালীন আগাম অর্থ পাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকদের পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তাও তৈরি হয়।

দেবীগঞ্জজুড়ে এখন বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠছে।

দেবীগঞ্জের অভিজ্ঞ জলপাই চাষি আমিরুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় দেড় দশক ধরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জলপাই চাষ ও বিপণনের সাথে যুক্ত। তুলনামূলকভাবে কম পরিচর্যা ও কম ঝুঁকির কারণে এই ফল চাষ অত্যন্ত লাভজনক। তিনি বলেন, "মৌসুমে জলপাই বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে আমার সারা বছরের সংসার খরচ চলে যায়। দেশের বড় বড় বাণিজ্যিক আচার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ভালো মানের ফল নিশ্চিত করতে আগেই বায়না দিয়ে রাখেন। ফল প্রস্তুত হলে চুক্তি অনুযায়ী তাদের কাছে জলপাই পৌঁছে দেওয়া হয়।"

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চুয়াডাঙ্গা থেকে জলপাই কিনতে আসা পাইকার মোমিনুল হক জানান, দেবীগঞ্জের জলপাইয়ের স্বাদ ও গঠন ভালো হওয়ায় খুচরা বাজারে এর টান বেশি। তিনি পুরো মৌসুমজুড়ে এখান থেকে জলপাই কিনে দেশের নানা প্রান্তে পাঠান। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কিছু ক্ষোভও রয়েছে। তাদের অভিযোগ, মোকামে জায়গার তীব্র সংকট, শৃঙ্খলার অভাব, চাঁদাবাজি এবং অন্যায্য অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের কারণে তাদের নানা প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়। এসব প্রশাসনিক দুর্বলতা দূর করা গেলে বাইরের ব্যবসায়ীদের সমাগম আরও বাড়বে বলে মনে করেন তারা।

পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুল মতিন জানিয়েছেন, দেবীগঞ্জ উপজেলায় অসংখ্য ছোট-বড় বাগান রয়েছে এবং নতুন চাষির সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। ভালো বাজারমূল্য ও অব্যাহত চাহিদার পাশাপাশি চলতি মৌসুমে পরিমিত বৃষ্টিপাত হওয়ায় ফলন বেশ আশাব্যঞ্জক হয়েছে।

কৃষি বিভাগের পর্যবেক্ষণ বলছে, জলপাইয়ের সাফল্যের পাশাপাশি পঞ্চগড়ে ড্রাগন ফল, মাল্টা, কমলা, পেয়ারা ও বাতাবিলেবুর বাণিজ্যিক চাষেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এসব ফলের আবাদ বাড়াতে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, দেবদারুতলা মোকামের অবকাঠামো আধুনিকায়ন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং পরিবহন সুবিধা সম্প্রসারণ করা গেলে এই বাজার দেশের মৌসুমি ফল বাণিজ্যের অন্যতম মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।