অক্টোবর ১১, ২০২৬, ১১:১৯ এএম
জরুরি পরিস্থিতি ও যেকোনো সংকটকালে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে এ খাতের নিরাপত্তা বাড়াতে একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ তৈরি করতে যাচ্ছে সরকার।
একই সঙ্গে প্রধান প্রধান জীবনরক্ষাকারী ওষুধের একটি ন্যূনতম সংরক্ষিত মজুত বা বাফার স্টক গড়ে তোলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জরুরি ওষুধের এই ন্যূনতম বাফার স্টক সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট বিধানযুক্ত কাঠামোর খসড়া প্রস্তুত করবে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্থানীয় কারখানাগুলোতে উৎপাদিত হলেও সক্রিয় ওষুধ উপাদান বা এপিআই এবং প্রয়োজনীয় মূল কাঁচামালের ৯০ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
এই বিশাল আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় অবস্থিত এপিআই শিল্প পার্কটি দ্রুত পুরোদমে চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
বর্তমান আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ও রোগীর ধরন বিবেচনায় নিয়ে দেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকীকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
সভায় দেশের ওষুধ খাতের মান নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল বেঞ্চমার্কিং টুলের আওতায় ম্যাচুরিটি লেভেল তিন অর্জনের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এতে কার্যকর বায়ো-ইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষার দেশীয় সক্ষমতা তৈরি, একটি আধুনিক সেন্ট্রাল মেডিসিন ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং ওষুধের মান ও পরীক্ষার উৎকর্ষ বাড়াতে ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ সহযোগিতা জোরদারের সুপারিশ করা হয়।
প্রস্তাবিত জাতীয় রোডম্যাপ মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে ওষুধ সরবরাহ সচল রাখার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
ওষুধ প্রস্তুতকারকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির সভায় জানান, দেশের উৎপাদন সক্ষমতা অত্যন্ত সুদৃঢ় হলেও কাঁচামালে আমদানিনির্ভরতা খাতটিকে কাঠামোগত ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে। তিনি সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা কাটাতে দ্রুত নীতিগত সহায়তা দাবি করেন এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য ২০ থেকে ৩০টি অত্যাবশ্যকীয় সক্রিয় কাঁচামালের অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির প্রস্তাব দেন।
তিনি আরও প্রস্তাব করেন, নবগঠিত তালিকা হালনাগাদ কমিটিতে ওষুধ প্রস্তুতকারক সমিতির প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। গজারিয়া এপিআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে নিজস্ব অর্থায়নে গ্যাস সঞ্চালন লাইন এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি কাঁচামাল ছাড়ের ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমতি প্রক্রিয়ায় যে দীর্ঘসূত্রতা হয়, তা দ্রুত সহজ করার দাবি জানান।
বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়েট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ৯০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে গিয়ে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সংগঠনটি জানায়, দেশে কাঁচামাল উৎপাদিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে শিল্প সুরক্ষিত থাকবে। ভারত ও চীনের উদাহরণ টেনে তারা উল্লেখ করে, দেশীয় কাঁচামাল শিল্প শক্তিশালী হলে তা ভবিষ্যতে বড় রপ্তানি খাতে রূপ নিতে পারে।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশের তৈরি ওষুধের বৈশ্বিক রপ্তানি প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলারে। ২০১০-১১ অর্থবছরে এ খাতে আয় ছিল চার কোটি ৪২ লাখ ডলার, যার তুলনায় বর্তমান রপ্তানি আয় প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কাঁচামাল উৎপাদনে নীতি সহায়তা দিলে শিক্ষিত তরুণদের জন্য ব্যাপক জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ চৌধুরী পরামর্শ দেন, এপিআই খাত পুরোপুরি সচল করতে প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি গবেষণায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত সরকারি তহবিল বরাদ্দের পাশাপাশি আধুনিক সেন্ট্রাল মেডিসিন ল্যাবরেটরি স্থাপনের ওপর জোর দেন।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে সরবরাহ অটুট রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি মেডিসিন সাপ্লাই কনটিনজেন্সি প্ল্যান প্রস্তুত এবং বাফার স্টক নির্ধারণ করা সময়ের দাবি। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত টাস্কফোর্সের আদলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন।
মহাপরিচালক আরও জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল বেঞ্চমার্কিং টুলের ম্যাচুরিটি লেভেল তিন অর্জনে নির্ধারিত ২১১টি সাব-ইন্ডিকেটরের মধ্যে ইতিমধ্যে ১৮৭টি সূচক সফলভাবে পূরণ হয়েছে। বাকি সূচকগুলো দ্রুত অর্জনে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের তাগিদ দেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানান, ১৯৯৮ সালে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ১১৭টি ওষুধের তালিকা করা হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি ও আগস্ট মাসের পর্যালোচনা এবং দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে আধুনিক চিকিৎসার সাথে সংগতি রেখে তালিকাটি সম্পূর্ণ যুগোপযোগী করার নির্দেশ দেন তিনি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন