অক্টোবর ১০, ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি বাড়াতে সারাদেশে ২০ হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরির বিশেষ কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। এর মধ্যে নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ এবং পুরুষদের জন্য ৪০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রিপ্রিনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ বা সংক্ষেপে পার্টনার প্রকল্পের মাধ্যমে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দেশের ৬৪ জেলার ২০৮টি উপজেলায় এই কার্যক্রম চলছে।
প্রকল্পের আওতায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বীজ, নার্সারি, মাশরুম, কেঁচো সার বা ভার্মিকম্পোস্ট, পাটজাত পণ্য ও দুগ্ধজাত খাদ্য তৈরিসহ বিভিন্ন উপখাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট কৃষিপণ্যের জন্য ভ্যালুচেইনভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে চলছে। পণ্য পাঁচটি হলো আলু, আম, কাঁঠাল, টমেটো ও সুগন্ধি চাল। এই ভ্যালুচেইন সংক্রান্ত নীতিমালা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন পেয়েছে।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের জন্য রয়েছে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা। গৃহ পর্যায়ে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রপাতি কেনার জন্য মোট ব্যয়ের ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। বাকি ৩০ শতাংশ অর্থ উদ্যোক্তাকে নিজে বহন করতে হচ্ছে।
মাশরুম, ভার্মিকম্পোস্ট ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার তৈরি করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পার্টনার প্রকল্পের এজেন্সি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৭৫ জনকে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরে আরও প্রায় ৭ হাজার জনকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা ও বাজার সংযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়িক বাধা দূর করতে প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ইনকিউবেশন সহায়তার কাজও চলছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় ইতোমধ্যে ৭৬৭টি মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে যে ফসলের উৎপাদন বেশি, সেখানে সেই ফসলকে কেন্দ্র করেই এই স্কুলগুলো তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে আলুর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ২২৭টি স্কুল। চলতি বছর আরও ৩৩৫টি নতুন স্কুল স্থাপনের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
এই কাঠামোর মাধ্যমে কৃষক, স্থানীয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, হিমাগার মালিক ও পরিবহন খাতের কর্মীদের এক ছাতার নিচে আনা হচ্ছে। ফলে মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হচ্ছে।
উদ্যোক্তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি সমাজে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান তৈরি করেন বলে মন্তব্য করেছেন পার্টনার প্রকল্পের সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ। তার মতে, নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষিকে একটি লাভজনক ও আধুনিক পেশায় রূপান্তর করা সম্ভব।
মাঠপর্যায়ে এই প্রশিক্ষণের সুফল মিলতে শুরু করেছে। গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তামিমা আক্তার ন্যান্সি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে ১২ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি শুরু করেছিলেন জ্যাম, জেলি, আচার এবং কাঁঠাল ও মাছের চিপস তৈরির কাজ।
প্রশিক্ষণের পর ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন ন্যান্সি। স্থানীয় কৃষি বিপণন কর্মকর্তার সহায়তায় ট্রেড লাইসেন্স ও স্বাস্থ্য সনদ সংগ্রহ করে তিনি গড়ে তোলেন ‘ন্যান্সি অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফুড’। বর্তমানে তার এই প্রতিষ্ঠানে চারজন কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে।
পরিকল্পনাহীনতা ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে দেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে ছিল বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে আধুনিকায়ন জোরদার করা গেলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির পথ আরও সুগম হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন