অক্টোবর ১০, ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
বৈদেশিক কর্মসংস্থান, তৈরি পোশাকশিল্পে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সমন্বিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বে অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আঞ্চলিক সম্মেলনে এই অভিমত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি স্পষ্ট করেন, সামাজিক সুরক্ষাকে কেবল নগদ আর্থিক অনুদানের মধ্যে সীমিত না রেখে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের টেকসই আয় বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অর্থনৈতিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন নীতিনির্ধারকেরা।
‘সবার জন্য এশিয়া: সরকারি সেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি’ শীর্ষক এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের যৌথ আয়োজক ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অনুষদ ও অক্সফাম ইন এশিয়া। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বার্ষিক সভার প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনের ‘অর্থনৈতিক সমতা অর্থায়ন: সরকারি সেবায় সম্পদ আহরণ’ শীর্ষক তৃতীয় অধিবেশনে বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি উল্লেখ করেন, করোনাভাইরাস মহামারি এবং অতীতের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক সংকটকে গভীর করেছিল। তার উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, ওই সংকটে নতুন করে প্রায় ৭০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যান।
নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির সমন্বয়হীনতা প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রচলিত ব্যবস্থার ফাঁকফোকড়ে প্রকৃত সুবিধা পাওয়ার যোগ্য অনেকে বাদ পড়েন এবং অনিয়মের কারণে অযোগ্য ব্যক্তিরাও সুবিধা পান। ফলে যাদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন, তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা সরাসরি পৌঁছানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
এই সংকট দূর করতে জীবনের প্রতিটি ধাপের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে জীবনচক্রভিত্তিক সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দেন তিনি।
উপদেষ্টা জানান, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে দেশের বিপুল শ্রমশক্তি যুক্ত হওয়ায় একদিকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে, অন্যদিকে তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশে ব্যাপকসংখ্যক নারী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন। এই দুই খাতের বিস্তার প্রমাণ করেছে যে উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ প্রসারিত করাই দারিদ্র্য দূরীকরণের সবচেয়ে টেকসই ভিত্তি।
সামাজিক সুরক্ষার আওতা আরও আধুনিক করতে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বিশদ পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি নারীদের হাতে সরকারি অর্থ পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, যাকে সরকার থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে সরাসরি অর্থপ্রদান বা ‘জিটুপি’ বলা হয়।
উপস্থাপিত প্রক্ষেপণ বলছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগীর সংখ্যা এক কোটি ৬১ লাখে উন্নীত হতে পারে, যার ফলে দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্ট হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাশাপাশি কৃষকদের সহায়তায় কৃষক কার্ড ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সুফলও তুলে ধরা হয়। এই কর্মসূচির লক্ষ্য উপযুক্ত কৃষকদের নগদ প্রণোদনা ও আধুনিক কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি সহজ করা। অর্থনৈতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের সুবাদে প্রচলিত পরিস্থিতির তুলনায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) শূন্য দশমিক সাত থেকে এক শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
দারিদ্র্য নিরসন ও মানবকল্যাণের সঙ্গে টেকসই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিতুমীর। এ প্রসঙ্গে সরকারের ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন পরিকল্পনা এবং পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখতে এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ফোরামে ছয় দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন তিনি।
প্রথম প্রস্তাবে তিনি জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে বিশেষ বহুপক্ষীয় তারল্য সহায়তা তহবিল গঠনের আহ্বান জানান। দ্বিতীয় প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র অস্থিরতার সময় খাদ্য ও সারের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে চালানের বিপরীতে আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি চালুর ওপর জোর দেন।
তৃতীয় প্রস্তাবে তিনি বৃহৎ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ধাক্কার মুহূর্তে দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার একটি স্বয়ংক্রিয় বৈশ্বিক কাঠামো তৈরির দাবি জানান, যাতে বৈদেশিক চাপে থাকা রাষ্ট্রগুলো জনসেবা ও উন্নয়ন বরাদ্দ অব্যাহত রাখতে পারে।
চতুর্থ প্রস্তাবে ধনী দেশগুলোর অব্যবহৃত বিশেষ উত্তোলন অধিকার (এসডিআর) ঝুঁকিতে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনুকূলে পুনর্বণ্টনের দাবি জানানো হয়। পঞ্চম প্রস্তাবে তিনি জলবায়ু অর্থায়নে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের সম্পদের সুষম বণ্টন এবং আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের কার্যকারিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
ষষ্ঠ প্রস্তাবে সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়াতে ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি জোরদারের তাগিদ দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মেলনে অক্সফামের বিশেষ নীতিপত্রের বিশদ তথ্য উন্মোচন করা হয়।
‘জন্ম থেকেই কারসাজির শিকার: এশিয়ায় বৈষম্য কীভাবে ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয় এবং কোন পাঁচটি সরকারি সেবা তা বদলাতে পারে’ শীর্ষক নীতিপত্রে উঠে আসে যে এশিয়ার শীর্ষ ধনী ১০ শতাংশ ব্যক্তির দখলে রয়েছে জাতীয় আয়ের ৬০ থেকে ৭৭ শতাংশ। বিপরীতে সবচেয়ে দরিদ্র অর্ধেক মানুষের ভাগে জোটে জাতীয় আয়ের মাত্র ১২ থেকে ১৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৫ সালে এসে এশিয়ার শতকোটিপতিদের পুঞ্জীভূত সম্পদ এক দশকে ১২০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে তিন লাখ ৪০ হাজার কোটি থেকে চার লাখ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে সম্পদবৈষম্য পরিমাপের গিনি সহগ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে শূন্য দশমিক ৭২-এ দাঁড়িয়েছে।
ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের কারণে এ অঞ্চলের ২৫ কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারেননি। উন্নয়নশীল এশিয়ার ৫০ কোটির বেশি মানুষ বর্তমানে দারিদ্র্যের মধ্যে কিংবা দারিদ্র্যের চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার ১৮ দশমিক নয় শতাংশ।
সরকারি ঋণের সুদের বোঝাও সামাজিক খাতে বিনিয়োগের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২১০ কোটির বেশি মানুষ এমন সব দেশে বসবাস করছেন, যেখানে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধেই শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের চেয়ে বেশি অর্থ চলে যায়।
তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ২০২২ সালেই ৪৪ হাজার ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল। সম্মেলনে সতর্ক করা হয় যে কঠোর রাজস্ব ব্যয় সংকোচনের নীতি সরকারি জনসেবা ও কল্যাণমূলক ব্যয়কে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
সামাজিক সুরক্ষার শূন্যতাও প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৬ দশমিক চার শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ২১০ কোটি নাগরিক, যেকোনো ধরনের সরকারি সামাজিক সুরক্ষা সুবিধার বাইরে রয়েছেন।
এ অঞ্চলের ৩৭টি দেশের অর্থনীতিতে মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে গড় কর-রাজস্বের হার মাত্র ১৯ দশমিক ছয় শতাংশ, যেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সদস্যভুক্ত উন্নত দেশগুলোতে এই হার ৩৩ দশমিক নয় শতাংশ।
অক্সফামের নীতিপত্রে সুপারিশ করা হয়েছে, এশিয়ার শীর্ষ ধনীদের পুঞ্জীভূত সম্পদের ওপর বছরে দুই থেকে পাঁচ শতাংশ হারে সম্পদ কর আরোপ করা হলে বছরে ৭৯ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তি রাজস্ব আদায় সম্ভব, যা জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করা যাবে।
জলবায়ু সংকট ও প্রযুক্তিগত বৈষম্যের বিষয়টিও আলোচনায় জায়গা পায়। ২০২৩ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এশিয়ায় প্রায় ছয় হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ায় ৩৩ কোটি নারী আজও মোবাইল ইন্টারনেটের আধুনিক সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।
নারীদের অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে জানানো হয়, নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই অসম শ্রমের বোঝা লাঘব করা গেলে এই অঞ্চলে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিকাশ ঘটবে।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের অধ্যাপক কেট পিকেট।
অধিবেশনগুলোতে বক্তব্য দেন থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. সোমসাক চুনহারাস, শ্রীলঙ্কার গ্রামীণ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নবিষয়ক মন্ত্রী ড. উপালি পান্নালিগে, লাও উইমেনস ইউনিয়নের নিনপাসেউথ জাইয়াফোনেসি এবং থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের সুফান্নাদা লোওয়াচাই।
অন্যান্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডেভিড ম্যাককয়, ফিলিপাইনের প্রতিনিধি জুড অ্যাসিডরে, চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অনুষদের ডিন অধ্যাপক নোপফল উইটভোরাপং, অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক জন স্যামুয়েল এবং অক্সফাম এশিয়ার অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান মুস্তাফা তালপুর।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন