শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬,

দিল্লিতে ধরপাকড় ঘিরে চরম উত্তেজনা, ৪ সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ আটক ৩ হাজার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ১০, ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

দিল্লিতে ধরপাকড় ঘিরে চরম উত্তেজনা, ৪ সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ আটক ৩ হাজার

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আয়োজিত রাজনৈতিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে দিনভর ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে দেশটির পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই সাঁড়াশি অভিযানে চার রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও প্রায় তিন হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। আটক সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রী হলেন পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার মানিক সরকার।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। দলটির অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোটি কোটি প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে সরাসরি সুবিধা পেয়েছে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি কর্তৃপক্ষ যাবতীয় অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার ভোর থেকেই রাজধানী দিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের জমায়েত রুখতে মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য। শহরের মূল সড়কগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়, বন্ধ রাখা হয় একাধিক মেট্রো স্টেশন ও বাজার এবং কেন্দ্রীয় দিল্লির নির্দিষ্ট অংশে সাময়িকভাবে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করে দেওয়া হয়।

সকালে মুম্বাই থেকে বিমানে দিল্লিতে পৌঁছানোর পরপরই রানওয়েতে থাকা উড়োজাহাজ থেকেই আটক করা হয় সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলটির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে।

উড়োজাহাজের ভেতর থেকে ধারণ করা এক ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ দীপকে অভিযোগ করেন, তারা গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে এসেছিলেন, কিন্তু পুলিশ তাদের চিহ্নিত অপরাধীদের মতো আচরণ করে হেফাজতে নিয়েছে।

এর আগে দলটির আইন বিভাগের প্রধান রত্না সিংকে গাড়ির ভেতর থেকে নামিয়ে আটক করে পুলিশ। এ ছাড়া ভারতের জনপ্রিয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকে হরিয়ানার গুরুগ্রামের নিজ বাসভবন থেকে হেফাজতে নেওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।

দুপুরের দিকে যন্তর মন্তরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়।

অন্যদিকে দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ এলাকায় অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালানোর সময় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুলিশ হেফাজতে নেয়। এ সময় তার সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেনসহ একাধিক দলীয় নেতাকেও আটক করা হয়। আটক হওয়ার পর বিরোধী নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিয়ে বিরোধী স্বর স্তব্ধ করার চেষ্টা চলছে।

বিক্ষোভে সংহতি জানিয়ে অংশ নিতে গিয়ে আটক হয়েছেন কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ একাধিক বামপন্থী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আটক বাম নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, বৃন্দা কারাট, এম ভি গোবিন্দন ও পি কে শ্রীমতী।

সিপিআই(এম) দলীয় সংসদ সদস্য জন ব্রিটাস অভিযোগ করেছেন, তাদের আটক করার পর দীর্ঘ সময় ধরে প্রিজন ভ্যানে পুরো দিল্লি শহর ঘোরানো হয় এবং পরবর্তীতে ছত্রসাল স্টেডিয়ামের অস্থায়ী বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছু সময় রাখার পর আবারও কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য না জানিয়ে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। আটক হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা এক ভিডিও বার্তায় আন্দোলনকারীদের প্রতি আহ্বান জানান, পুলিশ যেখানেই ব্যারিকেড দেবে সেখানেই রাস্তায় বসে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার।

আগের রাত থেকেই দিল্লির বাংলা সাহিব গুরুদোয়ারায় আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়েকশ আন্দোলনকারী। সকালে তারা মিছিল নিয়ে যন্তর মন্তরের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটকে লাঠিচার্জ করে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, গুরুদোয়ারা প্রাঙ্গণে প্রায় ৬০০ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে বাসে তুলে আটক করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

হায়দরাবাদ থেকে আসা পেশায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী অজয় জিঙ্গাদে জানান, সকাল থেকে যন্তর মন্তরে যাওয়ার চেষ্টা করা প্রতিটি দলের ওপর পুলিশ চড়াও হয় এবং ব্যাপক লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। শহরের দিল্লি হাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যেই সিজেপি নেতা আজিঙ্ক্যা শিন্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা দিয়ে কর্মীদের রাস্তায় নামার নির্দেশ দেন।

আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন গণমাধ্যমকর্মীরাও; কয়েকজনকে আটক করার তথ্য পাওয়া গেছে। সুপ্রিম কোর্টের ফটকে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানানোর সময় কয়েকজন আইনজীবীকেও সাময়িক আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সিজেপির পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে যে সরকারদলীয় চাপের মুখে তাদের দলের শীর্ষ নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে।

ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে ভোটার তালিকা সংস্কার নিয়ে চলমান এই উত্তেজনা মূলত নির্বাচন কমিশনের একটি অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা থেকে শুরু হয়। বিরোধীদের দাবি, বিশেষ সংশোধনী প্রক্রিয়ার নামে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম জাতীয় তালিকা থেকে একতরফাভাবে বাতিল করা হয়েছে।

কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তর হওয়া নাগরিক, ৩ কোটি নিরুদ্দেশ ব্যক্তি এবং ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত মানুষের নাম চিহ্নিত করে তালিকা থেকে অপসারণ করা হয়েছে। কোনো যোগ্য ভোটারের নাম অসাবধানতাবশত বাদ পড়লে তা পুনঃনিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। তবে বিজেপি একে রুটিন প্রশাসনিক কাজ দাবি করে বিরোধীদের ভোটে হেরে যাওয়ার ভয় বলে অভিহিত করেছে।