সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, গত মাসে নেপালে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়কর বন্যা বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা ও অভিযোজন প্রক্রিয়ায় নেপালকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান। বৃহস্পতিবার অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে অংশ নিয়ে তিনি এই ভাষণ দেন।
বক্তব্যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ভঙ্গুর হিমালয় পরিবেশব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে জমাট থাকা মাটি গলে যাচ্ছে, হিমবাহ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে এবং ঘন ঘন মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। গত মাসের শেষ দিকে নেপাল তার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে একটি হিমবাহসংক্রান্ত ধস থেকে সৃষ্ট সুনামিসদৃশ প্রবল ঢলে বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ছয় হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এই দুর্যোগে দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে একটি সমন্বিত সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার সাথে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন একত্রিত হয়ে হিমবাহের স্থানচ্যুতি এবং জমাট মাটির গলন প্রক্রিয়াকে তীব্র গতি দিয়েছে। বৈশ্বিক নির্গমনের বৈষম্য তুলে ধরে বালেন্দ্র শাহ উল্লেখ করেন, বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অংশ শূন্য দশমিক এক শতাংশেরও কম। সংকটের জন্য দায়ী না হয়েও নেপালকে এর চরম মাশুল দিতে হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বৈশ্বিক ব্যবস্থার ব্যর্থতায় তীব্র হওয়া এই দুর্যোগের বিরুদ্ধে একা লড়াই করার আর্থিক বা কারিগরি সক্ষমতা নেপালের নেই। তাই অভিযোজনের বিপুল ব্যয়ের একটি অংশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই বহন করতে হবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি হিমালয়া ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম নামে একটি আঞ্চলিক ফ্রেমওয়ার্ক গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। এই উদ্যোগে নেপালের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারত ও চীনকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের তথ্য আদান-প্রদান, আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতামত বিনিময়, হিমবাহ হ্রদগুলোর সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং যৌথ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৩৬ বছর বয়সী সাবেক শিল্পী বালেন্দ্র শাহ ছয় মাস আগে তরুণদের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সমর্থনে ব্যাপক জনআকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তবে সাম্প্রতিক এই হিমালয় বিপর্যয়ের পর তার প্রশাসনের মূল অগ্রাধিকার দুর্নীতিবিরোধী অভ্যন্তরীণ সংস্কার থেকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতির দিকে মোড় নিয়েছে। নেপাল ইতিমধ্যে জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে দুই কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা চেয়েছে। এটি তহবিলটির নিয়ম অনুযায়ী একক দেশের জন্য সর্বোচ্চ আর্থিক সীমা। তবে সরকারের প্রাথমিক হিসাবমতে এবারের দুর্যোগে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি ডলার হওয়ায় এই বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ২০২২ সালে পাকিস্তানের বন্যার পর এই তহবিল কার্যকর করা হলেও এটি এখনো মাঠপর্যায়ে অর্থ ছাড়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেনি।
তবে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা আসতে শুরু করেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র বন্যা-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে তিন কোটি ১০ লাখ ডলার আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেয়। এছাড়া বুধবার অনুষ্ঠিত এক কূটনৈতিক বৈঠকে জি-সাতভুক্ত দেশগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং যুক্তরাজ্যও নেপালকে কার্যকর সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন