শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬,

ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব মোদির ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ৩, ২০২৬, ১১:০৮ এএম

ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব মোদির ভারত

ছবি: সংগৃহীত

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা কূটনৈতিক নীরবতা ভেঙে এবার প্রকাশ্যেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি, বিশেষ করে শুল্ক আরোপ, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি এবং সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ভারতের উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। নিউইয়র্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট ভাষায় অবস্থান তুলে ধরেন। ওয়াশিংটনের একতরফা ও আত্মকেন্দ্রিক বাণিজ্যনীতির কঠোর সমালোচনা করে তিনি জানান, এমন সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

দশকের পর দশক ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে মতপার্থক্য তৈরি হলে ভারত তা আড়ালেই মীমাংসা করত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি সবসময় দ্বিপক্ষীয় চ্যানেলে আলোচনার পথ বেছে নিত, কারণ দেশটির ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের সঙ্গেই ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর সেই হিসাব পুরোপুরি বদলে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের খামখেয়ালি ও অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতির মুখে ভারত এখন নিজেদের অবস্থান সরাসরি ও প্রকাশ্যে তুলে ধরার কৌশল নিয়েছে।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে আসছিল যে ভারতীয় নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে বারবার নতিস্বীকার করছে। সম্প্রতি মোদি টেলিফোনে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। ফোনালাপটিকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করলেও আগের বছরগুলোর মতো ট্রাম্পকে ভালো বন্ধু আখ্যা দেওয়ার বদলে এবার ব্যবহৃত ভাষা ছিল অনেকটাই আনুষ্ঠানিক ও দূরত্বপূর্ণ। চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক চিয়েতিগজ বাজপেয়ির মতে, জয়শঙ্করের এই মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে এবং শুরুতে যে সম্পর্কের উজ্জ্বলতা দেখা যাচ্ছিল তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

বাণিজ্যিক বিরোধ এখন দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের জায়গা হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় পণ্য বাণিজ্যের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এই বাণিজ্যে ভারতের পক্ষে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। জয়শঙ্কর স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনো দেশের এত বেশি আত্মকেন্দ্রিক হওয়া অনুচিত যাতে নিজেদের স্বার্থের সিদ্ধান্তে অন্য দেশের নাগরিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি ইউক্রেন ও ইরানের সংঘাতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নীতি প্রণয়নে সাধারণ বোধবুদ্ধি ব্যবহারের আহ্বান জানান।

উভয় দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, মাথাপিছু আয় ও উৎপাদন ব্যবস্থার বিশাল পার্থক্যের কারণে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি এখনো সম্পন্ন করা যায়নি। ভারতের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা কৃষি খাত, যেখানে নিজস্ব কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষায় নয়াদিল্লি কয়েক দশক ধরে নিজেদের বাজার কঠোরভাবে সুরক্ষিত রেখেছে। এর ওপর ট্রাম্পের শুল্কনীতি পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। অতীতে ভারতের ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক চাপানো হয়েছিল। পরবর্তীতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট তা বাতিল করলে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেয়।

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প একটি বিতর্কিত আইনে স্বাক্ষর করেছেন, যার ফলে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার কারণে ভারতের মতো দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অজয় বিসারিয়ার মতে, কার্যকর হতে যাওয়া এই ১০০ শতাংশ শুল্ক দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে মারাত্মক বাধার মুখে ফেলবে। এতদিন নয়াদিল্লি ট্রাম্পের প্রকাশ্য চাপের মুখে ধৈর্য দেখালেও এখন আর বিষয়টি আড়ালে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

বাণিজ্যিক বিরোধের বাইরে পাকিস্তান ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যু নিয়ে দুই দেশের দূরত্বের গভীরতা আরও বেড়েছে। গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের এক সংক্ষিপ্ত সংঘাত হয়, যার সূত্রপাত হয়েছিল ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনার পর। ওই সংঘাতের পর ট্রাম্প দাবি করেন যে তার হস্তক্ষেপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকির ফলেই দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছায়। ভারত শুরু থেকেই কাশ্মীর ইস্যুকে একটি দ্বিপক্ষীয় বিষয় মনে করে এবং তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ফলে ট্রাম্পের এই ধরনের প্রকাশ্য দাবি এবং জাতিসংঘ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে নয়াদিল্লি ক্ষুব্ধ হয়।

অন্যদিকে ইসলামাবাদের নেতৃত্ব ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছে, তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে এবং তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে। ফলে ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের নতুন সমীকরণ ভারতের উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলেছে। জয়শঙ্কর স্পষ্ট ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে ভারত কয়েক দশক ধরে একটি প্রতিবেশী দেশের পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের ভুক্তভোগী। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যথাযথ সংবেদনশীলতা ও উপলব্ধির ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক হর্ষ পান্তের মতে, শীর্ষ পর্যায়ে যখন পারস্পরিক স্বার্থের সম্মান থাকে না, তখন কূটনৈতিক মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আনা ছাড়া উপায় থাকে না।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অভিবাসন নীতিও নয়াদিল্লির উদ্বেগের কারণ। বিশেষায়িত দক্ষ কর্মীদের জন্য দেওয়া মার্কিন এইচ-ওয়ান-বি ভিসা সুবিধার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল ভারতীয়রা। কিন্তু ট্রাম্পের মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন নীতির সমর্থকদের বিরোধিতার মুখে এই ভিসা কর্মসূচির ওপর ফি ও নানাবিধ বিধিনিষেধ বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। মানুষের অবাধ চলাচলকে যেখানে দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক উন্নয়ন হিসেবে দেখা হতো, সেখানে এখন রাজনীতি অর্থনৈতিক সুবিধার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্য নির্বাচন এবং জনমতের পরিবর্তনের কারণে মার্কিন চাপ নীরবে মেনে না নেওয়ার দাবি ভারতে জোরালো হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, তবে তার জন্য একটি বাস্তবমুখী বাণিজ্য চুক্তি হওয়া জরুরি। তবে ট্রাম্পের প্রচলিত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করার মনোভাবের কারণে নয়াদিল্লি এখন কেবল তার মেয়াদের সমাপ্তির অপেক্ষায় দিন গুনছে।