সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬,

আসিম মুনিরের প্রশাসনিক পুনর্গঠন পরিকল্পনায় পাকিস্তানে গভীর সংকট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম

আসিম মুনিরের প্রশাসনিক পুনর্গঠন পরিকল্পনায় পাকিস্তানে গভীর সংকট

ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের প্রধান সেনা অধিনায়ক আসিম মুনিরের প্রশাসনিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সীমান্ত সংঘাতের মধ্যেই এই বিতর্ক সামনে আসে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেনাপ্রধান বিদ্যমান চারটি প্রদেশের কাঠামো বদলে দেশকে ১২টি, ১৫টি কিংবা প্রায় ১৬০টির মতো ক্ষুদ্র প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করার প্রস্তাব সামনে এনেছেন। 

দৃশ্যত প্রশাসনিক দক্ষতা ও সুশাসনের কথা বলা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনীর একক কর্তৃত্ব পাকাপোক্ত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের বলয়ে রাখাই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। এই ক্ষুদ্র ইউনিটগুলো পরিচালিত হতে পারে সামরিক বাহিনীর প্রতি অনুগত ব্যক্তিদের মাধ্যমে।

এমন পদক্ষেপ দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল করে দিতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। পাশাপাশি প্রদেশগুলোর সাংবিধানিক রাজস্ব ও আর্থিক বরাদ্দ বন্ধের পথ তৈরি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারসহ সব স্তরে তীব্র রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

একই সময়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে।

গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য সংকটে পাকিস্তানকে সবচেয়ে নাজুক দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৩৩ শতাংশ শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য মৌলিক খাদ্য জোগাড় করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি খাতে পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে ৩০০ রুপি ছাড়িয়েছে।

অকার্যকর বিদ্যুৎ খাত এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারের আড়াই ট্রিলিয়ন রুপির দেনা জমে ওঠায় করাচি, রাওয়ালপিন্ডি ও লাহোরের মতো প্রধান শহরগুলোতে তীব্র লোডশেডিং চলছে। বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো রাজপথে তীব্র বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও সংঘাতের মাত্রা চরমে পৌঁছেছে। বন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তি এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় রাষ্ট্রপতির শাসন জারির আশঙ্কায় হাজার হাজার পিটিআই সমর্থক রাজধানী অভিমুখে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন। বিক্ষোভ ঠেকাতে ইসলামাবাদে হাজারেরও বেশি কন্টেইনার ফেলে পথঘাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ব্যাপক নিরাপত্তা বাহিনী নামানো হয়েছে, যা জনমনে ‘কন্টেইনারিস্তান’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

ইমরান খানের বোন এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিসহ প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের আটক করা হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী আফ্রিদির আমলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও প্রাণহানির পরিসংখ্যানকে আটকের কারণ দেখানো হলেও স্থানীয় পুলিশ দীর্ঘদিন ধরেই সেখান থেকে সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিল।

এদিকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুঞ্চ বিভাগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ওষুধের সংকটে রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপের দাবি জানিয়েছে। গিলগিত-বালতিস্তানে শীর্ষ নেতাদের বন্দি রাখার বিষয়টি জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলেও আলোচিত হয়েছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটিতে সহিংসতায় প্রাণহানির হার প্রায় ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার বড় একটি অংশ ঘটেছে বেলুচিস্তানে।

পশ্চিম সীমান্তেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। আফগান সীমান্ত থেকে তালেবান সদস্যরা ড্রোন ব্যবহার করে পাকিস্তানি সেনা চৌকিতে হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়া এবং তেহরান সফরে সেনাপ্রধানকে শীতল অভ্যর্থনা দেওয়ার ঘটনা দেশটির আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে তুলেছে। বহুমুখী এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই প্রশাসনিক সীমা পরিবর্তনের এমন উদ্যোগ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।