অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১০:০৬ পিএম
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজার যখন তীব্র অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের শেয়ারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত চাহিদা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংশয়, শেয়ারের অতিরিক্ত মূল্যায়ন এবং চীনা প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানির ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে নিয়ে গঠিত চীনের স্টার-৫০ সূচক চার মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকে উধাও হয়ে গেছে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, অর্থনৈতিক প্রণোদনার আশ্বাসে গত দুই বছর ধরে বাজারে যে উল্লম্ফন চলছিল, বর্তমান পতন তাতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। একই সাথে দীর্ঘদিনের তীব্র উত্থান-পতনের প্রবণতা ভেঙে একটি স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত বাজার গড়ে তোলার যে লক্ষ্য বেইজিংয়ের ছিল, তা গভীর বাধার মুখে পড়েছে। গত জুন মাসে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানোর পর চীনের শীর্ষ বৃহৎ কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত সিএসআই ৩০০ সূচক ইতোমধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার অন্যান্য বাজারের তুলনায় চীনের বাজারে শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ফলে পতনের আঘাতও হয়েছে অনেক বেশি তীব্র।
এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের শেয়ারে পতনের হার তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। তিন সপ্তাহ আগে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার পর নাসডাক সূচকে পতন ঘটেছে প্রায় ৬ শতাংশ।
চীনা বাজারে এই অস্বাভাবিক দরপতনের পেছনে কোনো একক তাৎক্ষণিক কারণ স্পষ্ট নয়। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারের মাত্রাতিরিক্ত দাম, প্রাতিষ্ঠানিক কর পরিশোধের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশের ডেটা সেন্টারে চীনা সরঞ্জাম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আশঙ্কাই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনের মূল ভূখণ্ডের ‘এ’-শেয়ার এবং হংকংয়ের ‘এইচ’-শেয়ার বাজারের মোট বাজারমূল্যের ৪২ শতাংশ এবং দৈনিক লেনদেনের ৫৭ শতাংশ সরাসরি এআই খাতের সঙ্গে যুক্ত। দেশটির শেয়ারবাজারে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আধিক্য থাকায় এই ধসে সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রির শেয়ারদর লেনদেন শুরুর পর থেকে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
গত আগস্ট মাসে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিটির শেয়ারের জন্য বরাদ্দের তুলনায় প্রায় আট হাজার গুণ বেশি আবেদন জমা পড়েছিল। পাশাপাশি শীর্ষ মেমরি চিপ প্রস্তুতকারক সিএক্সএমটির শেয়ারদরও গত এক মাসে এক-চতুর্থাংশের বেশি কমেছে।
গত বছর শেয়ারবাজারে আসার পর চীনা চিপ নির্মাতা মেটাএক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটস ও মুর থ্রেডস টেকনোলজির শেয়ারের দাম যথাক্রমে ৭০০ ও ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। কিন্তু গত জুলাই থেকে কোম্পানি দুটির শেয়ারদর প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় হাইনান প্রদেশের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী চেন ওয়েনশেং জানান, ইউনিট্রির মতো কোম্পানিতে সরকারি তহবিল বিনিয়োগ করায় তিনি আশ্বস্ত হয়ে এআই খাতে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান ধসে তিনি ও তার পরিচিত বিনিয়োগকারীরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত খাতের এমন অস্বাভাবিক বিপর্যয়ে হতাশ হয়ে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী এখন তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদে অর্থ স্থানান্তর করছেন। এতে উদীয়মান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার থেকে নতুন মূলধন সংগ্রহের পথ সংকুচিত হয়ে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তথ্যকেন্দ্রে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম সরবরাহে চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কাও বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজ দেশের তথ্যভাণ্ডার সুরক্ষায় চীনা যন্ত্রাংশ প্রবেশ বন্ধে আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে, তখন অপটিক্যাল যন্ত্রাংশ নির্মাতা ঝংজি ইনোলাইট ও ইওপ্টোলিংকের শেয়ারের দাম গত জুন ও জুলাইয়ের শীর্ষ অবস্থান থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে।
এত বড় দরপতনের পরও চীনের স্টার-৫০ সূচকের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের গড় মূল্যায়ন গত ১২ মাসের অর্জিত মুনাফার প্রায় ১০০ গুণ। অতীতে একপর্যায়ে এই মূল্যায়ন প্রায় ২৫০ গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক ১০০ সূচকের ক্ষেত্রে এই মুনাফা অনুপাত মাত্র ৩০ গুণের কাছাকাছি। এই ব্যাপক ব্যবধানের কারণে বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই মনে করছেন, চীনা বাজারে দরপতন প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
হংকংভিত্তিক লোটাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা হং হাও জানান, বাজারে চলমান এই তীব্র অস্থিরতার কারণে বহু প্রযুক্তি কোম্পানির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থমকে যেতে পারে।
বাজারের এই অনিয়ন্ত্রিত ফাটকা বিনিয়োগ সামাল দিতে চীনা নিয়ন্ত্রক সংস্থার গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের উন্মাদনা থামাতে কর্তৃপক্ষ ঋণনির্ভর বিনিয়োগ ও উচ্চগতির অ্যালগরিদমিক লেনদেনে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির সময় রাষ্ট্রীয় তহবিলগুলো মুনাফা সীমিত রাখার উদ্দেশ্যে শেয়ার বিক্রিও বাড়িয়েছিল।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা চীনের সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশনের কাছে রয়টার্সের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রশ্ন পাঠানো হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে সম্প্রতি কমিশনের চেয়ারম্যান উ ছিং পুঁজিবাজার সংস্কারে বিভিন্ন পক্ষের মতামত শুনেছেন বলে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
বেইজিংভিত্তিক কিয়ানচুয়াং ক্যাপিটালের অংশীদার লিও ওয়াং মনে করেন, প্রধান সূচকগুলোতে বাজারমূলধনের ভিত্তিতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আচরণে বিকৃতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু খাতে কৃত্রিম সম্পদের বুদবুদ তৈরি হলেও অন্যান্য উৎপাদনশীল খাত তীব্র মূলধন সংকটে পড়েছে।
তবে বাজার বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, এই সংশোধন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তাদের মতে, সম্প্রতি বিনিয়োগকারীদের ন্যায্য মুনাফা নিশ্চিত করতে যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তার অংশ হিসেবে বাজারে শেয়ারের অতিমূল্যায়ন স্বাভাবিক স্তরে নেমে আসা জরুরি ছিল।
আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসির গবেষণা জানাচ্ছে, গত তিন মাসে কিছুটা বিক্রি বাড়লেও এশীয় বিনিয়োগ তহবিলগুলোর মূল বরাদ্দে চীনা শেয়ারের হিস্যা এখনও শক্তিশালী। গোল্ডম্যান স্যাকসও তাদের সাম্প্রতিক বিনিয়োগ তালিকায় ইনোলাইট ও সিএক্সএমটিসহ চীনের কয়েক ডজন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত রেখেছে। ফরাসি প্রতিষ্ঠান বিএনপি পারিবাস সিকিউরিটিজের কৌশলবিদ উইলিয়াম ব্র্যাটনও সতর্কতার সাথে বাছাই করে বিনিয়োগের অনুকূল সুযোগ রয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন।
তবে চীনের মূল ভূখণ্ডের বিনিয়োগকারীরা এখনও সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছেন এবং শেয়ারের দাম আরও স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
সাংহাইভিত্তিক ঝুওঝুও ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের তহবিল ব্যবস্থাপক ওয়াং ঝুও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানান, চীনের অন্যান্য উৎপাদন শিল্পের মতো সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা ও এআই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শেষ পর্যন্ত কঠিন মূল্যযুদ্ধে জড়াতে হবে। এই নিয়মের কোনো ব্যত্যয় নেই এবং সব অর্থনৈতিক বুদবুদই একসময় ফেটে যায়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন