অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১০:৩৩ পিএম
দেশের উপকূলীয় এলাকা থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন মাছের শুঁটকিতে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।
চারটি প্রধান উপকূলীয় অঞ্চলের শুঁটকি পরীক্ষা করে অন্তত ৯ ধরনের কৃত্রিম প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী মেরিন পলিউশন বুলেটিনে গত ১৫ অক্টোবর এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ার থেকে প্রকাশিত সাময়িকীটিতে বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার ভিত্তিতে সামুদ্রিক দূষণসংক্রান্ত গবেষণা ফলাফল হিসেবে এটি স্থান পায়।
গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খানের তত্ত্বাবধানে।
গবেষক দলে স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্ত ছিলেন কাজী নুসরাত জাহান ঐশী, হাবিবুর রহমান পিয়াস, নাদিয়া ইসলাম রিয়া এবং সানজিদা জুথি। দেশের শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণের প্রধান চারটি কেন্দ্র কক্সবাজার, টেকনাফ, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা এবং সুন্দরবনের দুবলার চর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে এই যৌথ বিশ্লেষণ চালানো হয়।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ছয় প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ও চিংড়ি এই গবেষণার আওতায় আনা হয়।
নির্বাচিত মাছের মধ্যে রয়েছে লইট্টা, পোয়া, ছুরি, ফাইস্যা এবং বাগদা ও হরিণা চিংড়ি। চারটি অঞ্চল থেকে সংগৃহীত মোট ২৪টি স্বতন্ত্র নমুনার প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। এর মধ্যে কুয়াকাটা উপকূলের শুঁটকিতে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি মিলেছে সর্বোচ্চ মাত্রায়, যার ঠিক পরেই রয়েছে পর্যটন শহর কক্সবাজার।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পলিমার হ্যাজার্ড ইনডেক্স ব্যবহার করে গবেষকরা দেখেছেন, কুয়াকাটার নমুনায় দূষণের সূচক মান দুই হাজার ৬৪২ দশমিক সাত।
কক্সবাজারের শুঁটকিতে এই সূচকের মান পাওয়া গেছে এক হাজার ৪৬১ দশমিক এক।
পরীক্ষাগারে চিহ্নিত হওয়া ৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে পলিভিনাইল ক্লোরাইড এবং পলিস্টাইরিন। অতীতে মাছের লার্ভা বা পোকার আক্রমণ ঠেকাতে ব্যবসায়ীরা ডিডিটি ও নগাভসের মতো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিষিদ্ধ রাসায়নিক ও ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার করতেন। এখন বিষাক্ত রাসায়নিকের পাশাপাশি খাদ্য শৃঙ্খলে অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা যুক্ত হওয়ায় মানুষের শারীরিক জটিলতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খান জানিয়েছেন, গৃহস্থালি, পৌরসভা এবং শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য উপকূলে মিশে সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণায় পরিণত হচ্ছে।
সেই দূষিত পানি থেকে ধরা মাছ ও তা থেকে সনাতন পদ্ধতিতে তৈরি শুঁটকিতে এসব কণা প্রবেশ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, খোলা মাঠে বা ধূলিমলিন স্থানে না শুকিয়ে সৌরশক্তিচালিত বা পরিচ্ছন্ন ছাউনিযুক্ত অবকাঠামোয় শুঁটকি তৈরি করা জরুরি। এ ছাড়া মাছ প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহূত প্লাস্টিক শিট, নাইলন দড়ি এবং প্যাকিং উপকরণের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সমুদ্রদূষণ রোধে বর্জ্যের সঠিক পুনর্ব্যবহার এবং সরকারি কঠোর নীতিমালা বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষ অপূরণীয় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন