শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬,
আন্তর্জাতিক সংবাদ

স্টারলিংক বন্ধে মিয়ানমারে বাড়ছে প্রাণহানির শঙ্কা, ব্যাহত চিকিৎসা ও শিক্ষা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নভেম্বর ৬, ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম

স্টারলিংক বন্ধে মিয়ানমারে বাড়ছে প্রাণহানির শঙ্কা, ব্যাহত চিকিৎসা ও শিক্ষা

মিয়ানমারের সংঘাতকবলিত বিভিন্ন অঞ্চলে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের হাজার হাজার টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ ও প্রতারণা চক্রের ব্যবহার বন্ধ করতে স্পেসএক্সের নেওয়া পদক্ষেপের প্রভাব এখন পড়েছে দেশটির জরুরি যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে। বিশেষ করে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলার আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় বেসামরিক মানুষের জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের চাপের মুখে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে স্টারলিংকের ব্যবহার ঠেকাতে স্পেসএক্স বিভিন্ন সন্দেহভাজন এলাকায় কয়েক হাজার টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় করেছে। তবে এই পদক্ষেপের প্রভাব অপরাধী চক্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এমন অনেক মানুষ, যাদের কাছে স্টারলিংক ছিল বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র কার্যকর মাধ্যম।

মিয়ানমারে একুশ শতকের একুশ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ে। জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থার বাইরে থাকা অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় বিকল্প যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে স্টারলিংকের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে। ব্ল্যাক মার্কেট ও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে সংগ্রহ করা টার্মিনাল ব্যবহার করে স্থানীয় বাসিন্দা ও জান্তাবিরোধী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখতেন।

এই সংযোগকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল বিমান হামলার আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা। বিমানঘাঁটির আশপাশে থাকা পর্যবেক্ষকেরা যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের তথ্য সংগ্রহ করে দ্রুত দূরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের কাছে পাঠাতেন। বিশেষ করে খনি ও আবাসিক এলাকায় বসবাসকারীরা এসব বার্তার মাধ্যমে সম্ভাব্য হামলার আগে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ পেতেন।

তবে স্টারলিংক টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় হওয়ার পর এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। এর মর্মান্তিক উদাহরণ দেখা যায় গত পয়লা সেপ্টেম্বর মাও চি এলাকার একটি খনিতে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায়। স্থানীয় এক বিদ্রোহী কমান্ডারের দাবি, বিমানঘাঁটির কাছাকাছি এলাকায় স্টারলিংক সংযোগ বন্ধ থাকায় হামলার আগাম সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব হয়নি। ওই ঘটনায় পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন এবং গুরুতর আহত হন আরও ছয়জন।

স্টারলিংক টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় করার পেছনে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারণা ব্যবসা। শত শত কোটি ডলারের এই অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে মার্কিন প্রশাসনের চাপের মুখে স্পেসএক্স সন্দেহভাজন এলাকাগুলোতে অভিযান চালায়।

মিয়ানমারের থাইল্যান্ড সীমান্তসংলগ্ন কুখ্যাত কে কে পার্কসহ বিভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ডে চীনা মাফিয়া সিন্ডিকেট আন্তর্জাতিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় স্টারলিংক ব্যবহার করছিল। এসব অপরাধমূলক কার্যক্রম বন্ধ করতে কয়েক হাজার স্টারলিংক কিট নিষ্ক্রিয় করা হয়।

কিন্তু অভিযানের আওতায় অপরাধীদের পাশাপাশি সাধারণ ব্যবহারকারীদের ডিভাইসও বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কাচিন, কারেন্নি, রাখাইন ও সাগাইং অঞ্চলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের অন্তত বিশ শতাংশ টার্মিনাল স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় হয়েছে। ফলে এসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।

ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতাল ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে। এসব এলাকার ফিল্ড হাসপাতালগুলো বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জটিল রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে পরামর্শ নিত। কিন্তু সংযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সংঘাতপূর্ণ এলাকায় চিকিৎসাসেবা পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যোগাযোগব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় চিকিৎসকদের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে আগে থেকেই সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা আরও চাপে পড়েছে।

মিয়ানমারের নির্বাসিত জাতীয় ঐক্য সরকার এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মতে, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে এক কোটি ত্রিশ লাখের বেশি মানুষ গুরুতর মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন। যোগাযোগের এই বিপর্যয় তাদের জন্য জরুরি সহায়তা পাওয়ার পথও কঠিন করে তুলছে।

যোগাযোগব্যবস্থার সংকট থেকে বাদ পড়েনি দেশটির শিক্ষার্থীরাও। জান্তা সরকারের নজরদারি এড়িয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে জাতীয় ঐক্য সরকার প্রায় ছয় হাজার ভার্চুয়াল স্কুল পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইন্টারনেট সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু স্টারলিংক টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব ভার্চুয়াল স্কুলের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনায় বাধার মুখে পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিতেও বাধ্য হচ্ছে।

সব মিলিয়ে মিয়ানমারে স্টারলিংক টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় করার ঘটনা শুধু ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হওয়ার বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানবিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ। আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করতে স্পেসএক্সের উদ্যোগের উদ্দেশ্য থাকলেও এর বাস্তব প্রভাব পড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন জনগোষ্ঠীর ওপরও।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে যেখানে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থার সুযোগ সীমিত, সেখানে এভাবে টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। বিশেষ করে বিমান হামলার আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়া, চিকিৎসাসেবায় বিঘ্ন এবং শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি দেশটির মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।