অক্টোবর ২৪, ২০২৫, ১০:৪৮ এএম
শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ে চিন্তিত মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এই ওজন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য চেষ্টারও অন্ত থাকে না। কেউ জিমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরান, কেউ বা যোগব্যায়ামের শান্ত ভঙ্গিমায় খুঁজে নেন সুস্থতার পথ। আবার এমন অনেকেই আছেন, যাদের কাছে ওজন কমানো বা ফিট থাকার সবচেয়ে সহজ, সুলভ এবং স্বস্তিদায়ক ব্যায়াম হলো সাধারণ হাঁটাচলা।
কর্মব্যস্ত জীবনে অফিসে টানা চেয়ারে বসে থাকার ফাঁকে করিডোরে একটু পায়চারি করা হোক, কিংবা রাতে ভরপেট খাওয়ার পর ছাদে কিছুক্ষণ পায়চারি—হাঁটার এই সহজ অভ্যাসকেই অনেকে তাদের ফিটনেস রুটিনের মূলমন্ত্র বানিয়ে নিয়েছেন। চিকিৎসকরাও একবাক্যে স্বীকার করেন, প্রতিদিন ভারী ব্যায়ামের সময় না পেলেও অন্তত কিছুটা সময় নিয়ম করে হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাস গড়ে তোলা স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু যারা দ্রুত মেদ ঝরিয়ে ওজন কমাতে চান, তাদের মনে প্রায়শই একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়—কোন সময়ে হাঁটলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়?
সকালে হাঁটা বেশি কার্যকর, নাকি বিকেলে বা সন্ধ্যায়?এই প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত লক্ষ্য করা যায়। একদল বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সকালে, বিশেষ করে ভোরের দিকে হাঁটার রয়েছে বাড়তি এবং অনন্য কিছু স্বাস্থ্যগত সুফল। দিনের শুরুতে নির্মল, সতেজ বাতাসে হাঁটলে ফুসফুসের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়, এটি ধুলোবালি ও দূষণমুক্ত থাকায় ফুসফুস পরিষ্কার থাকে। যারা হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য ভোরের হাঁটা বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে, কারণ এটি শ্বাসযন্ত্রকে সচল রাখতে সাহায্য করে।
একই সঙ্গে, সকালের শান্ত পরিবেশে হাঁটলে হৃৎস্পন্দনের হারও স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে থাকে বলে মনে করা হয়। এই বিশেষজ্ঞদের দাবি, সকালে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করলে হজমশক্তি বা মেটাবলিজম প্রক্রিয়া উন্নত হয়। ফলে গ্যাস, অম্বল বা বদহজমের মতো অস্বস্তিকর সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি মেলে। আর হজম প্রক্রিয়া যখন স্বাভাবিক ও সক্রিয় থাকে, তখন শরীরে অপ্রয়োজনীয় চর্বি জমার প্রবণতা কমে আসে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সরাসরি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তা ছাড়া, দিনের শুরুতে কিছুটা সময় শরীরচর্চা করলে শরীর ও মন দুই-ই সতেজ এবং চনমনে হয়ে ওঠে।
এটি সারাদিনের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যম জোগায় এবং মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে। এমনকি যারা অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্যও সকালের দিকে নিয়ম করে হাঁটাহাঁটি উপকারী হতে পারে বলে মনে করেন তারা।তবে বিশেষজ্ঞদের আরেকটি অংশ মনে করেন, বিশেষ করে শীতকালে বা যেসব শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি, সেখানে ভোরের দিকে হাঁটা সবসময় সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। কারণ এই সময়ে বাতাসে ধুলাবালি, গাড়ির ধোঁয়া, ফুলের রেণু (পোলেন) এবং অন্যান্য দূষণকারী কণার ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
এই দূষিত বাতাস হাঁটার সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করলে তা অ্যালার্জি, হাঁচি-কাশি বা শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। তাই এই বিশেষজ্ঞদের একাংশের পরামর্শ হলো, ভোরের পরিবর্তে রোদ ওঠার পর বা দিনের আলো আরেকটু বাড়লে হাঁটা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। এতে একদিকে যেমন দূষণের মাত্রা কিছুটা কমে আসে, তেমনি শরীরে সূর্যের হালকা উষ্ণতা লাগার সুযোগ থাকে, যা ভিটামিন ডি সংশ্লেষণেও সহায়ক হতে পারে এবং শরীরকেও চনমনে রাখতে পারে।
অন্যদিকে, বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে হাঁটারও রয়েছে নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র কিছু উপকারিতা। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা, মানসিক চাপ এবং ক্লান্তির পর বিকেলে বা সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলে তা ‘স্ট্রেস বাস্টার’ হিসেবে দারুণ কাজ করে। এটি মনকে শান্ত করে, স্নায়ুকে শিথিল করে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। অনেকের অভিজ্ঞতা বলে, দিনের ক্লান্তি কাটিয়ে শরীরে নতুন উদ্যম ফিরিয়ে আনতেও এই সময়ের হাঁটা বেশ কার্যকর। তাছাড়া, বিকেল বা সন্ধ্যায় সূর্যের তেজ থাকে না, ফলে দীর্ঘ সময় ধরে হাঁটলেও শরীর অতিরিক্ত ঘেমে ক্লান্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
যারা দিনের বেলায় সময় পান না, তাদের জন্য এই সময়টি হাঁটার জন্য আদর্শ। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, বিকেল বা রাতে নিয়মিত হাঁটলে রাতের ঘুম গভীর ও ভালো হয়। আর নিয়মিত হাঁটার ফলে ধীরে ধীরে শরীরের বাড়তি চর্বিও গলতে শুরু করে, যা ওজন কমাতে সহায়ক হয়।তাহলে মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়—ওজন কমানোর জন্য আদর্শ সময় কোনটি, সকাল নাকি বিকেল বা সন্ধ্যা? আধুনিক গবেষণা এবং বেশিরভাগ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কোনো সুনির্দিষ্ট বা এককথায় উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। সকালে হাঁটার যেমন কিছু বিশেষ সুবিধা আছে, তেমনি বিকেলে হাঁটারও নিজস্ব উপকারিতা রয়েছে।
দ্রুত মেদ ঝরানোর ক্ষেত্রে সময়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো হাঁটার নিয়মিততা, গতি এবং সময়কাল। আপনি দিনে ঠিক কোন সময়টায় হাঁটতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, কোন সময়টা আপনার দৈনন্দিন রুটিনের সঙ্গে সহজে মানিয়ে যায়, সেটাই আপনার জন্য হাঁটার সেরা সময়। মূল বিষয় হলো ‘হাঁটা’ এবং সেটা ‘নিয়মিত’ করা, সময়ের হিসাবটা এখানে গৌণ। আপনি সকালে হাঁটুন বা বিকেলে, নিয়মিত হাঁটলে শরীরচর্চার যে সার্বিক সুফল—যেমন ক্যালরি বার্ন হওয়া,
হৃদযন্ত্র ভালো থাকা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকা, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি—তা আপনি পাবেনই। তাই বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত পরামর্শ হলো, সকাল না বিকেল—এই সময় নিয়ে দ্বিধায় না ভুগে, আজ থেকেই আপনার সুবিধামতো সময়ে হাঁটা শুরু করুন। ধীরে ধীরে হাঁটার সময় ও গতি বাড়ান। নিয়মিত হাঁটতে থাকলেই দেখবেন, আপনার শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরে যাচ্ছে, শরীর হয়ে উঠছে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝরঝরে ও চাঙা।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন