অক্টোবর ২৪, ২০২৫, ১২:০৩ পিএম
ডায়াবেটিস শব্দটি এখন আর অপরিচিত নয়, বরং আমাদের দেশে ঘরে ঘরে এক অতি পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে জেঁকে বসেছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসের গড়মিল এবং জিনগত কারণ মিলিয়ে এই রোগের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছেই। তবে ডায়াবেটিস হওয়ার আগেও একটি পর্যায় থাকে, যা নিয়ে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, কিন্তু তা এখনো ডায়াবেটিস হিসেবে নির্ণয় করার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, এই অবস্থাকে বলা হয় ‘প্রি-ডায়াবেটিস’।
এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এক অর্থে আশঙ্কাজনকও বটে, কারণ এই পর্যায়ে সামান্য অসতর্কতা বা জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না আনলে তা খুব সহজেই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে রূপান্তরিত হতে পারে, যা একটি আজীবনের রোগ। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় ধরা পড়লে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো পুরোপুরি প্রতিরোধ করাও সম্ভব। অতিরিক্ত ক্যালরি ও কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ঘুমের অনিয়ম এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ—এই বিষয়গুলোই মূলত রক্তে শর্করার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী।
তাই প্রি-ডায়াবেটিস নির্ণয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জীবনযাপন পদ্ধতি ও খাদ্যাভ্যাসে আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। এর পাশাপাশি, আমাদের রান্নাঘরে থাকা কিছু সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি পানীয়ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সকালে খালি পেটে নিয়মিত কয়েকটি বিশেষ প্রাকৃতিক পানীয় পান করলে তা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করতে পারে বলে মনে করেন পুষ্টিবিদরা। আসুন জেনে নিই এমন পাঁচটি কার্যকরী প্রাকৃতিক পানীয় সম্পর্কে।
প্রথমেই আসে মেথি ভেজানো পানির কথা। মেথি দানা ভারতীয় উপমহাদেশে মসলা হিসেবে বহুল ব্যবহৃত হলেও এর ঔষধি গুণ অপরিসীম, বিশেষ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে। মেথিতে প্রচুর পরিমাণে দ্রবণীয় ফাইবার বা আঁশ থাকে, যা হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। এর ফলে খাবার থেকে শর্করা রক্তে মেশার প্রক্রিয়াটিও ধীরগতিতে সম্পন্ন হয়, যা খাওয়ার পর হঠাৎ করে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়াকে প্রতিহত করে। এই ফাইবার ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করে।
তাই ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বা নিয়ন্ত্রণে মেথি পানি একটি চমৎকার ঘরোয়া উপায় হতে পারে। এটি তৈরি করাও খুব সহজ। রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস পানিতে এক চা চামচ মেথি দানা ভিজিয়ে রাখুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে প্রথমে এই পানিটুকু পান করুন এবং সম্ভব হলে ভেজানো মেথি দানাগুলোও চিবিয়ে খেয়ে নিন। নিয়মিত এটি করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে।
দ্বিতীয় পানীয়টি হলো করলার রস। করলার নাম শুনলেই হয়তো এর তেতো স্বাদের কথা মনে করে অনেকে নাক সিঁটকান, কিন্তু এই তেতো সবজিটিই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অমৃতসম। করলায় ‘পোলিপেপটাইড-পি’ বা ‘পি-ইনসুলিন’ নামক একটি যৌগ রয়েছে, যা ইনসুলিনের মতো কাজ করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সরাসরি সাহায্য করে।
এছাড়া এতে থাকা অন্যান্য উপাদান ইনসুলিনের নিঃসরণ এবং কার্যকারিতা উভয়ই বাড়াতে সহায়তা করে। তাই স্বাদে অত্যন্ত তেতো হলেও, করলার রস প্রি-ডায়াবেটিস এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস—উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে। সকালে খালি পেটে তাজা করলার রস (বীচি ফেলে দিয়ে ব্লেন্ড করে ছেঁকে নেওয়া) পান করা যেতে পারে। তবে এর পরিমাণ এবং নিয়মিত সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তৃতীয় কার্যকরী পানীয়টি হলো দারুচিনির চা। দারুচিনি কেবল খাবারের স্বাদ আর গন্ধই বাড়ায় না, এর রয়েছে দারুণ স্বাস্থ্য উপকারিতাও। দারুচিনিতে থাকা বিভিন্ন বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। এর মানে হলো, শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনকে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে, যা রক্ত থেকে শর্করা কোষে প্রবেশে সহায়তা করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এক কাপ গরম পানিতে একটি ছোট দারুচিনির কাঠি বা আধা চা চামচ দারুচিনির গুঁড়া মিশিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিয়ে সেই পানি চায়ের মতো পান করলে উপকার পাওয়া যায়। এটি কেবল রক্তে শর্করাই নিয়ন্ত্রণ করে না, নিয়মিত দারুচিনি চা পান করলে তা শরীরের বিপাক হার বাড়িয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করতে পারে।
চতুর্থ উপকারী পানীয় হলো আমলকির জুস। আমলকি ভিটামিন সি এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের এক অসাধারণ উৎস। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো অগ্ন্যাশয়ের কোষগুলোকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোর কার্যকারিতা উন্নত করে। ভিটামিন সি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখে। ফলে নিয়মিত আমলকির রস সেবন করলে তা ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এবং নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। এটি শরীরের সামগ্রিক মেটাবলিজম বা বিপাক ক্রিয়াকে উন্নত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও শক্তিশালী করে।
তাজা আমলকি ব্লেন্ড করে রস বের করে বা বাজারে প্রাপ্ত ভালো মানের খাঁটি আমলকির জুস (চিনি ছাড়া) সকালে খালি পেটে খাওয়া যেতে পারে।সবশেষে আসে গ্রিন টি বা সবুজ চায়ের কথা। সাধারণ চা বা কফির বদলে নিয়মিত গ্রিন টি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী, বিশেষ করে যারা প্রি-ডায়াবেটিসে ভুগছেন বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছেন। গ্রিন টি-তে ক্যাটেচিন ও পলিফেনলের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ থাকে।
এই যৌগগুলো ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে এবং শরীরের বিপাক হার উন্নত করতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে তিন থেকে চার কাপ চিনি ছাড়া গ্রিন টি পান করলে তা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতে পারে। এটি শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতেও সাহায্য করে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি। তবে মনে রাখতে হবে, এই প্রাকৃতিক পানীয়গুলো কোনোভাবেই ডায়াবেটিসের মূল চিকিৎসার বিকল্প নয়।
এগুলো কেবল নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। যেকোনো নতুন খাদ্যাভ্যাস শুরু করার আগে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিসের মতো অবস্থায়, অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন