সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎচালিত ট্রেন চলাচলের যুগে প্রবেশের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। প্রাথমিকভাবে রাজধানী ও এর সংলগ্ন দুটি প্রধান শিল্পাঞ্চলকে যুক্ত করে ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে এই বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। `নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে বৈদ্যুতিক ট্রাকশন প্রবর্তন` শীর্ষক এই বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উত্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা।
মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) যৌথভাবে উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা জোগান দেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের ৩০ জুনের মধ্যে এই সম্পূর্ণ রেলপথের অবকাঠামোগত রূপান্তর শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৩ হাজার ৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ নেটওয়ার্ক পুরোটাই ডিজেলচালিত ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল। নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে সাধারণ ট্রেনের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি খরচ সাশ্রয় হবে এবং ট্রেনের গড় গতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যবর্তী এই রুটটি একটি অত্যন্ত ব্যস্ত ট্রানজিট লিংক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে পুরোনো ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের ধীরগতির কারণে ট্রেনের গতি কমে যায় এবং যাত্রীদের চাহিদা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত ট্রিপ পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রেললাইনের ওপরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক তার বা ওভারহেড ওয়্যার টানানো হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর নির্মাণ করা হবে বিশেষায়িত ট্রাকশন সাবস্টেশন। এছাড়া এই সেকশনে যুক্ত হবে পরিবেশবান্ধব আধুনিক ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) ট্রেন এবং কম্পিউটারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বৈদ্যুতিক ট্রেন অতি দ্রুত সর্বোচ্চ গতি তুলতে পারে এবং একইভাবে দ্রুত গতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। ফলে যাত্রীবাহী স্টপেজের পর খুব কম সময়ের মধ্যে ট্রেনগুলো নির্ধারিত গতি ফিরে পাবে, যা এই রুটের সামগ্রিক যাতায়াতের সময় অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে আনবে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রাথমিক মূলধন ব্যয় বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবস্থায় রেল পরিচালনার ব্যয় ৩৫ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। প্রতিবেশী ভারতে ইতিমধ্যে তাদের ৬৫ হাজার ৩০০ কিলোমিটার ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের প্রায় ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৮ হাজার ৮১২ কিলোমিটার রেলপথ বিদ্যুতায়ন করা সম্পন্ন হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম সেকশনেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। সম্প্রতি ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বৈদ্যুতিক ট্রাকশন চালুর লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই এই মেগা প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন