শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সার ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ: ৬৪ জেলায় শতভাগ বরাদ্দ

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ০২:১৯ পিএম

সার ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ: ৬৪ জেলায় শতভাগ বরাদ্দ

ছবি: দিনাজপুর টিভি গ্রাফিক্স

কৃষকদের চাহিদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবে আগামী অক্টোবর মাসের জন্য দেশের ৬৪ জেলার চাহিদার বিপরীতে সারের শতভাগ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। রবি ও বোরো মৌসুমের সম্ভাব্য চাপ মোকাবেলায় আগাম আমদানি, পর্যাপ্ত মজুত তৈরি, দ্রুত পরিবহন এবং মাঠপর্যায়ে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার ১৪ সেপ্টেম্বরের বরাদ্দপত্র ও তথ্যসারণি থেকে এসব তথ্য নিশ্চিত করা গেছে। মাঠের বাস্তব চাহিদাই সারের মূল বরাদ্দ মাপকাঠি।

সরকারি নথি অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে ৬৪ জেলায় টিএসপি সারের মোট চাহিদা ৭০ হাজার ৫২ মেট্রিক টন, ডিএপির চাহিদা এক লাখ ৫০ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন এবং এমওপির চাহিদা ৯৩ হাজার ৬৫৪ মেট্রিক টন। তিনটি প্রধান নন-ইউরিয়া সারের মোট চাহিদা তিন লাখ ১৪ হাজার ৬১৬ মেট্রিক টন এবং সমপরিমাণ সার বরাদ্দের পূর্ণ বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে টিএসপির সম্পূর্ণ ৭০ হাজার ৫২ মেট্রিক টন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ডিএপির মোট বরাদ্দের মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এক হাজার মেট্রিক টন এবং বিএডিসি এক লাখ ৪৯ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন বরাদ্দ করেছে। এমওপির ৯৩ হাজার ৬৫৪ মেট্রিক টনের সমপরিমাণ সারও জেলাওয়ারি চাহিদা মেনে বরাদ্দ করা হয়েছে।

এবারের ব্যবস্থাপনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কেন্দ্র থেকে এককালীন ঢালাও বরাদ্দ না চাপিয়ে জেলা ও তৃণমূলের প্রকৃত প্রয়োজন অনুসারে পৃথক বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা জেলায় টিএসপি ৭৪০ মেট্রিক টন, নারায়ণগঞ্জে ৮৪০ মেট্রিক টন, মুন্সীগঞ্জে ৮৯৬ মেট্রিক টন, মানিকগঞ্জে এক হাজার ৬৮৪ মেট্রিক টন, নরসিংদীতে এক হাজার ৪৮৭ মেট্রিক টন, টাঙ্গাইলে এক হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন, ময়মনসিংহে এক হাজার ৯০০ মেট্রিক টন এবং কুষ্টিয়ায় এক হাজার ৮৮২ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বেশি চাহিদাসম্পন্ন কৃষিপ্রধান অঞ্চল বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও রংপুরে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর জেলাগুলোর উৎপাদন বজায় রাখতে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।

এমওপি সারের জেলাভিত্তিক বরাদ্দে বগুড়ায় চার হাজার ৫৪০ মেট্রিক টন, রাজশাহীতে তিন হাজার ৩৬০ থেকে তিন হাজার ৯৬০ মেট্রিক টন, পাবনায় দুই হাজার ৪৮৩ মেট্রিক টন, নওগাঁয় দুই হাজার ২৬৯ মেট্রিক টন, নাটোরে এক হাজার ৯০০ মেট্রিক টন এবং ময়মনসিংহে এক হাজার ৯৩০ মেট্রিক টন বণ্টন করা হয়েছে। রাজধানী ও এর আশপাশ থেকে শুরু করে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা এবং পার্বত্য তিন জেলাসহ দেশের কোনো অঞ্চলকেই কেন্দ্রীয় বরাদ্দের বাইরে রাখা হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের নথিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মাসভিত্তিক চাহিদাপত্র বিশ্লেষণ করে সরবরাহ পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। নিরাপত্তা মজুত হিসেবে দেশে ইউরিয়া পাঁচ লাখ মেট্রিক টন, টিএসপি চার লাখ মেট্রিক টন, ডিএপি পাঁচ লাখ মেট্রিক টন এবং এমওপি তিন লাখ মেট্রিক টন সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা চূড়ান্ত করা হয়েছে। রবি ও বোরো মৌসুমে সারের সামগ্রিক চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে প্রস্তুত সরবরাহ রয়েছে ৫১ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন, যা চাহিদার তুলনায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন বেশি।

সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে গত ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এক লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। অনুমোদিত চালানের মধ্যে বেলারুশ থেকে ৩০ হাজার টন এমওপি, মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি এবং সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির চুক্তি হয়েছে। এর আগে আগস্ট মাসেও বিভিন্ন উৎস থেকে তিন লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়।

গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া চার লাখ ১৮ হাজার টন, টিএসপি তিন লাখ ৪৩ হাজার টন, ডিএপি তিন লাখ দুই হাজার টন এবং এমওপি এক লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টন মজুত ছিল। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ পরিবহনের মধ্যে ছিল আরও এক লাখ ২৮ হাজার ২০০ টন টিএসপি, এক লাখ ১৪ হাজার ৬০০ টন ডিএপি এবং এক লাখ ৮৯ হাজার ৪০০ টন এমওপি।

বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফেরাতে ৬৪ জেলায় বিশেষ মনিটরিং সেল গঠনের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দপত্রে বলা হয়েছে, ডিলারদের মধ্যে উপজেলার নির্ধারিত সমহারে উপ-বরাদ্দ দিতে হবে এবং বেসরকারি খাতের এলসিভিত্তিক উত্তোলনের হিসাব হালনাগাদ রাখতে হবে। ডিলারদের দ্রুত অর্থ জমা দিয়ে নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের হাতে সার বিক্রি করতে হবে। সিটিজেন চার্টারের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে পরবর্তী মাসের নন-ইউরিয়া বরাদ্দ সম্পন্ন করার নিয়মও মানা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম জানান, বর্তমান ব্যবস্থাপনায় আগাম প্রস্তুতি ও এলাকাভিত্তিক চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কোন এলাকায় কতটুকু সার কখন লাগবে এবং তা কীভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছাবে, তা নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেন, শুরু থেকেই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অক্টোবর মাসে শতভাগ বরাদ্দ সম্পন্ন হওয়ায় চলতি মৌসুমে সার সংকট নিয়ে কৃষকদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নেই।