সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সারের সংকট এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ থামছে না। কোথাও ডিলারের কাছে সার মিলছে না, আবার অন্যত্র সেই সারই দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি রুখতে মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে।
গত ২৫ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং কৃষি মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি কমিটি গঠন করে। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ কমিটি মাঠপর্যায়ে ডিলার ব্যবস্থাপনা তদারকি করছে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের কমিটি ডিলারদের বরাদ্দ ও উত্তোলনের তথ্য যাচাই করছে। কমিটির সদস্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসক, কৃষি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক চলছে। খুচরা বিক্রেতাদের বাদ দেওয়ার যে ভুল বার্তা ছড়িয়েছিল তা দূর করা হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে।
ত্রাণমন্ত্রী আরও জানান, আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কিছু ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ আসছে। যারা সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করছে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকেই সংকটের বেশিরভাগ অভিযোগ আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসবের পেছনে রাজনৈতিক কারসাজি আছে কি না তা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি রবিশস্য ঘিরে কৃষকদের অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতা ও আতঙ্ক দূর করতে কাজ করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
সরকারি নজরদারির মধ্যেই বিভিন্ন জেলায় অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বাস্তব চিত্র দেখা গেছে। ঝিনাইদহে সরকার নির্ধারিত ২৭ টাকার টিএসপি বিভিন্ন বাজারে ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হরিশঙ্করপুর ইউনিয়নের ডিলার আশরাফুল আলম টিটোর পয়েন্টে ক্যাশ মেমো ছাড়াই ২৭ টাকার ইউরিয়া ৩২ টাকা, ২০ টাকার এমওপি ২৮ থেকে ৩৫ টাকা এবং ২১ টাকার ডিএপি ৩০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। সদরের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের কৃষক গোলাম নবী জানান, চার বিঘা জমিতে আগাম শীতকালীন সবজির জন্য ডিলারের কাছে সার না পেয়ে অন্য কৃষকের মাধ্যমে প্রতি কেজি টিএসপি ৫০ টাকায় কিনতে হয়েছে। শৈলকুপার রাণীনগর গ্রামের কৃষক ইসহাক আলী অভিযোগ করেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও সরকারি দামে সার মেলে না, তবে বাড়তি টাকা দিলে তা সহজেই পাওয়া যায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান ও জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন জানান, কৃত্রিম সংকট রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও জরিমানা অব্যাহত রয়েছে।
অভিযানে বিভিন্ন স্থানে বিপুল অবৈধ মজুতও ধরা পড়ছে। রাজশাহীর দুর্গাপুরে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৬৭০ বস্তা সার জব্দ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা ফারজানা। দিনাজপুরের খানসামায় পৃথক তিনটি অভিযানে অবৈধভাবে মজুত করা এক হাজার ৫৭৭ বস্তা সার জব্দ করেছে প্রশাসন। সেখানে দুই ডিলারকে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কুড়িগ্রামের রাজারহাটেও চাহিদামতো সার না পেয়ে কৃষকদের খালি হাতে ফেরার অভিযোগ উঠেছে। সেখানে নাজিমখান ইউনিয়নে সেপ্টেম্বর মাসের ৪৪ টন ইউরিয়া মাত্র ১০ দিনেই শেষ হয়ে যায় এবং উমর মজিদ ইউনিয়নে অতিরিক্ত ১০ টন বরাদ্দ দিয়েও কৃষকদের চাহিদা মেটানো যায়নি।
অথচ সরকারি হিসেবে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ লাখ ৯৩ হাজার টন সার মজুত ছিল, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৯২ হাজার টন বেশি। এর মধ্যে ইউরিয়া তিন লাখ ৯৪ হাজার, টিএসপি তিন লাখ ৩০ হাজার, ডিএপি দুই লাখ ৯৪ হাজার এবং এমওপি এক লাখ ৭৫ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ এনামুল হক জানান, প্রতিটি জেলার জন্য একজন করে কর্মকর্তা যুক্ত করে ডিলারদের কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং কোনো অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন