সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬,
কৃষি বিপ্লবের ইতিহাস

জিয়াউর রহমানের কৃষি বিপ্লব ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখা

জাতীয় ডেস্ক

নভেম্বর ২, ২০২৬, ১০:৩৪ পিএম

জিয়াউর রহমানের কৃষি বিপ্লব ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখা

ছবি: সংগৃহীত

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী পদক্ষেপে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ সূচিত হয়েছিল। ১৯৩৬ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত কর্মজীবনে তিনি যে প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও মাটির কাছাকাছি যাওয়ার মানসিকতা দেখিয়েছেন, তা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে সত্তর দশকের শেষভাগে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুকে সচিবালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে কৃষকের ধানক্ষেতে স্থানান্তর করার যে যুগান্তকারী উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে তৃণমূলমুখী উৎপাদনের রাজনীতি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। 

গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে‍‍` স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি গ্রামীণ জনপদকে স্বাবলম্বী করার এক বাস্তবমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। পরনির্ভরশীলতা দূরীকরণ ও খাল খনন কর্মসূচি

দায়িত্ব গ্রহণের সময় বাংলাদেশ তীব্র খাদ্য ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক ত্রাণের ওপর চরম নির্ভরশীলতায় ভুগছিল। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ চাল ও গম আমদানি করতে জাতীয় আয়ের বড় অংশ ব্যয় হতো। পরনির্ভরতার এই গ্লানি মোচনে তিনি কৃষকের সেচ সংকট দূর করার ওপর জোর দেন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে জমিতে সেচ দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি সূচনা করেন দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি।

তিনি নিজেই কোদাল হাতে মাটিতে নেমে কাজের সূচনা করতেন।

মাত্র দেড় বছরের মধ্যে সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি খাল খনন ও পুনঃখনন সম্পন্ন হয়। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে নদীনালা ও খালের উপরিভাগের পানি দিয়ে সারা বছর চাষাবাদের যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তিনি দেখিয়েছিলেন, তা বর্তমান জলবায়ু সংকটের যুগেও সমান প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে দেশে সেচ ব্যবস্থার প্রায় ৮১ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে এবং আর্সেনিক দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে, যা জিয়ার সেই উপরিভাগের পানি সংরক্ষণের দূরদর্শিতাকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়।

বীজ অধ্যাদেশ ও উন্নত কৃষি উপকরণের প্রসার

কৃষি উৎপাদন বাড়াতে ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে প্রণয়ন করা হয় ঐতিহাসিক বীজ অধ্যাদেশ। উচ্চফলনশীল ইরি ও বোরো ধানের পাশাপাশি গমের বিস্তার ঘটাতে সরকারি ভর্তুকিতে সার ও উন্নত বীজ প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এর পাশাপাশি হাজার হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপ এবং পাওয়ার পাম্প সাশ্রয়ী মূল্যে ও সহজ কিস্তিতে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। গ্রাম পর্যায়ে সেচ কমিটি গঠনের ফলে প্রান্তিক চাষীরা সম্মিলিতভাবে পানি বণ্টনের সুবিধা লাভ করে, যা শীতকালীন অনাবাদি জমিতে বছরে তিনবার ফসল উৎপাদনের পথ খুলে দেয়।

কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি ও কৃষি ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে তিনি কৃষি যন্ত্রপাতি ও সার সরবরাহে বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করেন। এই উদারীকরণ নীতির ফলে মাত্র দুই বছরের মধ্যে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর ও আধুনিক হার্ভেস্টার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

মহাজন ও সুদখোরদের শোষণ থেকে কৃষকদের বাঁচাতে তিনি কৃষি ব্যাংকের শাখা গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত করেন এবং জামানতবিহীন ‍‍`বিশেষ কৃষি ঋণ কর্মসূচি‍‍` চালু করেন। ফলে সাধারণ কৃষকরা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরাসরি পুঁজি পাওয়ার সুযোগ পান। গ্রামীণ অবকাঠামোর রূপান্তরে ১৯৭৭ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা কৃষিতে সেচযন্ত্র চালানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্যশস্য রপ্তানির রেকর্ড

কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ১৯৭৮ সালে চালু করা হয় শস্য গুদাম ঋণ কর্মসূচি, যা কৃষকদের অভাবের তাড়নায় কম দামে ফসল বিক্রির হাত থেকে রক্ষা করে।

সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল ক্রয়ের নীতি গ্রহণ করায় ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ ১ দশমিক ০৩ মিলিয়ন টন চাল সরকারিভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এর ফলেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সীমিত পরিসরে বিদেশে চাল রপ্তানির সামর্থ্য অর্জন করে। প্রধান খাদ্যশস্যের পাশাপাশি ডাল, তেলবীজ ও শীতকালীন শাকসবজির আবাদ বাড়িয়ে ফসলের বহুমুখীকরণ উৎসাহিত করা হয়।

কৃষি গবেষণা ও যুবশক্তির উৎপাদনমুখী রূপান্তর

কৃষিকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে যুক্ত করতে ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে দিনাজপুরের নশিপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয় গম গবেষণা কেন্দ্র। একই সাথে প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে গাজীপুরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে সমন্বিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, যা আবহাওয়া ও পরিবেশোপযোগী বিভিন্ন ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ শুরু করে।

জাতীয় উৎপাদন বাড়াতে তিনি যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিক্ষিত তরুণদের হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ ও আধুনিক চাষাবাদে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেন। জিয়াউর রহমানের প্রণীত ১৯ দফা কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল এই কৃষিনির্ভর আত্মনির্ভরশীলতা, যা বাংলাদেশের আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।