নভেম্বর ২, ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম
সৌদি আরবে কর্মরত প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি শ্রমজীবীর নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের অধিকার নিশ্চিত করতে বিস্তারিত জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। সোমবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের জন্য করণীয় ও বর্জনীয় নির্ধারণ করে এই নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় এই শ্রমবাজার থেকে দেশে আসছে রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রবাসীদের সচেতনতা ও স্থানীয় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণই তাদের যেকোনো আইনি জটিলতা বা হয়রানি থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।
যাত্রার আগের সতর্কতা ও প্রস্তুতি
সৌদি আরব যাত্রার আগেই ভিসা, নিয়োগকর্তার তথ্য ও কাজের চুক্তি সতর্কতার সাথে যাচাই করে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-র বহির্গমন ছাড়পত্র, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। নিজের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় সব গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিজের হেফাজতে ও দেশে নিরাপদ স্থানে রাখার পরামর্শ দিয়েছে সরকার।
দালালের মৌখিক আশ্বাসে কোনো প্রকার অর্থ লেনদেন করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে বলা হয়েছে। ভিজিট ভিসায় গিয়ে কাজের চেষ্টা করা বেআইনি। পাশাপাশি নিজের পাসপোর্ট কখনোই নিয়োগকর্তা কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে জমা রাখা যাবে না।
ইকামা, চুক্তি ও নথিপত্রের হেফাজত
প্রবাসে অবস্থানকালে মূল ইকামা সবসময় সঙ্গে রাখতে হবে এবং সরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম Absher-এর মাধ্যমে ইকামার মেয়াদ নিয়মিত যাচাই করতে হবে। কাজের চুক্তি ও ওয়ার্ক পারমিটের সঠিকতা নিশ্চিত করতে হবে সৌদি মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের QIWA প্ল্যাটফর্মে। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগেই তা নবায়ন বা পুনরায় ইস্যুর আবেদন করা আবশ্যক।
কোনো অবস্থাতেই না বুঝে বা সাদা কাগজে স্বাক্ষর কিংবা টিপসই দেওয়া যাবে না। নিজের গোপন পিন, পাসওয়ার্ড কিংবা ওটিপি অন্য কারও সাথে ভাগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইকামা নবায়নের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব নিয়োগকর্তার, ফলে এর জন্য তৃতীয় কোনো পক্ষকে অর্থ না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কর্মক্ষেত্রের অধিকার ও বেতন লেনদেন
নিয়োগচুক্তির অনুলিপি এবং কর্মস্থলে কাজের সব প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করতে হবে। বেতনের অর্থ অবশ্যই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে গ্রহণ করতে হবে এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টের নথি সংরক্ষণ করা জরুরি। নিয়োগকর্তার সাথে কোনো সমস্যা বা জটিলতা তৈরি হলে সরাসরি সৌদি শ্রম আদালত বা মকতব আমলের হেল্পলাইন ১৯৯১১ নম্বরে অথবা বাংলাদেশ দূতাবাসে জানাতে হবে।
`স্কিল ভিসা` নিয়ে গিয়ে ভিন্ন কোনো পেশায় বা নিজের নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা ছাড়া বাইরে অন্য কোথাও কাজ করা যাবে না। কর্মক্ষেত্রে বিরোধ তৈরি হলেও দায়িত্ব ফেলে পালানো আইনত দণ্ডনীয়। কর্মবিরতি, ধর্মঘট পালন বা যেকোনো ধরনের কাজে বাধা সৃষ্টির কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চাকরি পরিবর্তন ও দেশে ফেরার নিয়ম
চাকরি পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিলে তা সৌদি সরকারের QIWA প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আইনসম্মতভাবে স্থানান্তর করতে হবে। দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলে আগেই নিজের ওপর কোনো জরিমানা বা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা (ট্রাভেল ব্যান) রয়েছে কি না, তা যাচাই করা আবশ্যক। সৌদি আরব ত্যাগের পূর্বে স্থানীয় মোবাইল সিম ও ব্যাংক হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করতে হবে।
সঙ্গে ৪০ হাজার সৌদি রিয়াল বা তার সমপরিমাণ অর্থ কিংবা স্বর্ণালংকার থাকলে বিমানবন্দরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথভাবে ঘোষণা দিতে হবে। নতুন কাজের আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়ার আগে সেখানে যোগ দেওয়া যাবে না। ভিসা নিশ্চিত না হয়ে বিমানবন্দরে যাওয়া এবং ফাইনাল এক্সিট ভিসার নির্ধারিত সময়সীমা পার করা আইনত নিষিদ্ধ। এছাড়া অর্থের লোভে অন্যের স্বর্ণ বা মুঠোফোন বহন করা থেকে বিরত থাকতে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
সামাজিক শিষ্টাচার ও প্রতিবেশীর প্রতি আচরণ
জনসমক্ষে শালীন পোশাক পরিধান ও মার্জিত আচরণ বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যেকোনো সেবায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো এবং প্রবীণদের সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশ কাগজপত্র দেখতে চাইলে শান্তভাবে তা প্রদর্শন করতে হবে। উন্মুক্ত স্থানে থুতু, পানের পিক বা ময়লা ফেলা এবং প্রকাশ্যে প্রস্রাব করা সৌদি আরবে দণ্ডনীয় অপরাধ। রাস্তায় বিবাদ, গালিগালাজ, মারামারি কিংবা জাতি, বর্ণ ও দেশ নিয়ে কটূক্তি করা নিষিদ্ধ।
অচেনা কোনো শিশুর সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং কোনো শিশুকে অনুমতি ছাড়া কোলে নেওয়া, স্পর্শ করা বা খাবার দেওয়া যাবে না। হারিয়ে যাওয়া শিশু দেখলে তৎক্ষণাৎ পুলিশকে জানাতে হবে। নারীদের দিকে তাকিয়ে থাকা, অনুসরণ করা, স্পর্শ করা বা যোগাযোগ নম্বর চেয়ে বার্তা পাঠানো সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যের উপস্থিতি ছাড়া কারও বাসাবাড়িতে কাজের জন্য প্রবেশ করা বা অনুমতি ছাড়া প্রতিবেশীর বাসায় যাওয়া নিষিদ্ধ। পুরুষদের জন্য বিপণিবিতান বা পার্কের পারিবারিক অংশে একা প্রবেশ করা এবং প্রতিবেশীর বাসায় উঁকিঝুঁকি দেওয়া সম্পূর্ণ অনুচিত।
ধর্মীয় বিধান ও স্থানীয় রীতিনীতি
নামাজের নির্ধারিত সময়ে কাজকর্ম সাময়িক বন্ধ রেখে নামাজ আদায় করতে হবে। পবিত্র রমজান মাসে দিনের বেলা জনসমক্ষে খাওয়া-দাওয়া ও ধূমপান করা নিষিদ্ধ। যেকোনো লেনদেন ও খাবার গ্রহণে ডান হাত ব্যবহার করতে হবে। মসজিদে অবস্থানকালে মুঠোফোন সাইলেন্ট রাখা বাধ্যতামূলক।
সৌদি রাজপরিবার, সরকার কিংবা ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়ে যেকোনো প্রকার নেতিবাচক মন্তব্য বা অনলাইনে পোস্ট দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কোনো ধরনের মিছিল, সমাবেশ কিংবা বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করা যাবে না। তন্ত্রমন্ত্র, তাবিজ-কবচ বা কবিরাজি চিকিৎসা চালানো বেআইনি। পাশাপাশি মসজিদের ভেতর কোনো ধরনের ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনের তৎপরতা চালানো যাবে না।
সাইবার সুরক্ষা ও প্রচার মাধ্যমে সতর্কতা
সামাজিক মাধ্যমে কোনো তথ্য বা সংবাদ প্রকাশের আগে তার সত্যতা নিশ্চিত হতে হবে। মুঠোফোন ও বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড এবং দ্বিস্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র অনুমোদিত অফিশিয়াল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করতে হবে এবং ভিপিএন ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে।
কারও অনুমতি ছাড়া নারী, শিশু কিংবা পরিবারের সদস্যদের ছবি তোলা আইনত অপরাধ। কোনো ধরনের অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য বা কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট শেয়ার করা যাবে না। বিশেষ করে সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা নিরাপত্তা-সংবেদনশীল স্থানের ছবি ও ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ বা আদান-প্রদান করা গুরুতর অপরাধ।
সড়ক নিরাপত্তা ও জরুরি মুহূর্তের পদক্ষেপ
চলাচলের ক্ষেত্রে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির হালনাগাদ বিমা থাকা বাধ্যতামূলক। গতিসীমা মেনে চলার পাশাপাশি সিটবেল্ট ব্যবহার করতে হবে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে নাজম ও পুলিশের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন গ্রহণ করতে হবে। ট্রাফিক সংকেত যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে এবং জরিমানার অর্থ দ্রুত পরিশোধ করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোনে কথা বলা নিষিদ্ধ। কোনো সড়ক দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়া গুরুতর অপরাধ।
দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে উদ্ধারকর্মীদের কাজের সুবিধার জন্য পথ পরিষ্কার রাখতে হবে। চরম প্রাণঝুঁকি না থাকলে অপেশাদারভাবে আহত ব্যক্তিকে টানাটানি করা যাবে না। সেখানে অযথা ভিড় করা কিংবা ছবি-ভিডিও ধারণ করা নিষিদ্ধ। দুর্ঘটনাকবলিত বা মৃত ব্যক্তির টাকা ও সামগ্রীতে হাত দেওয়া যাবে না। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পুলিশকে কেবল সত্য বিবরণ জানাতে হবে।
অর্থ ব্যবস্থাপনা, ওষুধ ও স্বাস্থ্যবিধি
রেমিট্যান্সের অর্থ কেবল বৈধ ব্যাংক ও অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে দেশে পাঠাতে হবে। যেকোনো অননুমোদিত হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলে অর্থ লেনদেন আইনত দণ্ডনীয়। নিজের ব্যবহৃত সিম, ব্যাংক কার্ড বা হিসাব অন্য কাউকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যাবে না। অন্যের ঋণের জামিনদার হওয়া কিংবা নিজের নামে অন্যের ব্যবসা পরিচালনা করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
সৌদি আরবে দেশ থেকে ওষুধ নিতে হলে দেশটির খাদ্য ও ওষুধ কর্তৃপক্ষের (SFDA) পূর্বানুমোদন নিতে হবে, যার অনলাইন ঠিকানা cds.sfda.gov.sa। অনুমোদিত ওষুধের মূল মোড়ক ও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র সঙ্গে রাখতে হবে। অতিরিক্ত বা প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বহন করা নিষিদ্ধ। অন্যের দেওয়া কোনো ব্যাগ বা প্যাকেট বহন করা যাবে না। সব ধরনের মাদক ও জুয়া থেকে দূরে থাকতে হবে, কারণ মাদক সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
প্রচণ্ড গরমের মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি পান এবং ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত উন্মুক্ত রোদে কাজ করা নিষিদ্ধ। কাজের সময় হেলমেট, সেফটি বেল্টসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে হবে। কক্ষের ভেতরে চুলা জ্বালিয়ে ঘুমানো এবং বৈদ্যুতিক সকেটে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপ দেওয়া মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করে।
পারিবারিক জীবন ও আইনি যোগাযোগ
পবিত্র উমরাহ ও হজ পালনের ক্ষেত্রে সরকারি নুসুক অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে অনুমোদন নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া হজ পালন কিংবা হজযাত্রী পরিবহন করা বেআইনি। যেকোনো বিয়ে আইনসম্মতভাবে নিবন্ধন করা এবং নবজাতকের জন্মনিবন্ধন দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। যেকোনো গোপন বা নিবন্ধনবিহীন বিয়ে এবং অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানো সৌদি আইনে গুরুতর অপরাধ।
প্রবাসীদের সচেতন করে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যেকোনো বিপদে পুলিশি সহায়তার জন্য রিয়াদ, মক্কা, মদিনা ও পূর্বাঞ্চলে ৯১১ এবং অন্যান্য অঞ্চলে ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ৯৯৭, অগ্নিনির্বাপণে ৯৯৮ এবং সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ৯৯৩ নম্বরে ফোন দিতে হবে।
শ্রম সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য ১৯৯১১ এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ে ৮০০১০০০১২৫ ও কনস্যুলার সেবার জন্য ৮০০১০০০১২৬ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। এছাড়া ঢাকার প্রবাসবন্ধু কলসেন্টারের নম্বর ১৬১৩৫। না বুঝে কোনো আরবি নথিতে স্বাক্ষর না করা এবং আইনি জটিলতা নিরসনে কোনো প্রকার মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালকে অর্থ না দিয়ে সরাসরি দূতাবাসের আইনি পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকার।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন