সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬,

আইনের শাসন সূচকে পাকিস্তানের অবনমন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নভেম্বর ২, ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

আইনের শাসন সূচকে পাকিস্তানের অবনমন

ছবি: সংগৃহীত

আইনের শাসন সূচকে পাকিস্তানের ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়া নিয়ে দেশটির বিচার বিভাগের তীব্র সমালোচনা হলেও এই পরিস্থিতির সামগ্রিক দায় কেবল আদালতের ওপর চাপানো সমীচীন নয়।

একটি দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার মূল্যায়নে আদালতের ভূমিকার বাইরেও সরকার, প্রশাসনিক সদিচ্ছা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তদন্ত সংস্থা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় জড়িত বিভিন্ন অংশীজন ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা অন্যতম প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) প্রকাশিত ২০২৫ সালের সূচক বিশ্লেষণ করে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ১৪৩টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৩০ নম্বরে। দেশটির সার্বিক স্কোর শূন্য দশমিক ৩৭।

আটটি সুনির্দিষ্ট স্তম্ভের ভিত্তিতে এই আন্তর্জাতিক তালিকা তৈরি করা হয়। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার ব্যবস্থা, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, প্রশাসনিক বিধিবিধানের সঠিক প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার। এসব মানদণ্ডের মধ্যে কেবল কয়েকটি ক্ষেত্রে আদালতের সরাসরি এখতিয়ার থাকলেও সামগ্রিক ফল বিচার বিভাগের একার কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে না। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিভাগে পাকিস্তান ১৪৩টি দেশের মধ্যে সর্বনিম্নে অবস্থান করছে, যার সরাসরি দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্বরাষ্ট্র প্রশাসনের ওপর বর্তায়।

বিভিন্ন পৃথক স্তম্ভে পাকিস্তানের অবস্থান বেশ বৈপরীত্যপূর্ণ।

দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায় দেশটির অবস্থান ১২৯তম হলেও ফৌজদারি বিচার কার্যক্রমে অবস্থান ১০১তম। আন্তর্জাতিক তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ সামগ্রিক সূচকে ১২৫তম অবস্থানে থাকলেও দেওয়ানি বিচারে ১৩২তম এবং ফৌজদারি বিচারে ১১৮তম স্থানে রয়েছে। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অমিল লক্ষ্য করা যায়। যেমন তুরস্ক সামগ্রিক সূচকে ১১৮ নম্বরে থাকলেও ফৌজদারি বিচারে তাদের অবস্থান ১০৬তম। রাশিয়া সামগ্রিকভাবে ১১৯তম অবস্থানে থাকলেও ফৌজদারি বিভাগে তাদের অবস্থান ১২৮তম এবং ব্রাজিল সামগ্রিকভাবে ৭৮ নম্বরে থাকলেও ফৌজদারি বিচারে ১১১তম অবস্থানে নেমে গেছে। এসব তথ্য-উপাত্ত প্রমাণ করে যে সাধারণ র‍্যাঙ্কিংয়ের পাশাপাশি খাতের পৃথক মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করে।

তবে সূচকে পাকিস্তানের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থার কিছু অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও চিহ্নিত হয়েছে।

সাধারণ মানুষের দেওয়ানি বিচারপ্রাপ্তির সহজলভ্যতা ও ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের স্কোর শূন্য দশমিক ৩৬। অযৌক্তিক দীর্ঘসূত্রতা ও বিলম্বের ক্ষেত্রে এই স্কোর আরও নেমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ২৮-এ এবং আদালতের রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে স্কোর শূন্য দশমিক ৩৫। অর্থাৎ বিচারপ্রার্থীদের জন্য অর্থনৈতিক ব্যয়ভার, আদালতের ভৌগোলিক দূরত্ব এবং দীর্ঘসূত্রতা এখনও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।

এসব জটিলতা কাটাতে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ৮৬ দফার একটি সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত অগ্রগতি প্রতিবেদনে জানানো হয়, ৮৬টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে ইতোমধ্যে ৬৪টি সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের তথ্য ও সরাসরি সহায়তার জন্য একাধিক জনসেবা কেন্দ্র চালু, অনলাইনে মামলার নথি প্রক্রিয়াকরণ ও ট্র্যাকিং, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মামলার ভার্চুয়াল শুনানি এবং বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বিচারপ্রার্থীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিতকরণ। পাশাপাশি নারী ও প্রান্তিক বিচারপ্রার্থীদের আইনি সহায়তা পেতে বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের মামলাজট নিরসনেও কিছু লক্ষণীয় অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির হার আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় দশ মাসে জেলা আদালতগুলো প্রায় ১৪ লাখ ৭০ হাজার নির্ধারিত সময়সীমার মামলা নিষ্পত্তি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সূচকগুলো কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করতে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার ত্বরান্বিত করতে ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করে। তবে শুধু একটি সম্মিলিত র‍্যাঙ্কিং দিয়ে বিচার অঙ্গনের সব বাস্তবতা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। দিনশেষে আইনের শাসনের মূল মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সাধারণ নাগরিকেরা কতটা সহজে, কম ব্যয়ে এবং সময়মতো আদালতের দ্বারস্থ হয়ে ন্যায়বিচার ভোগ করতে পারছেন তার ওপর।