নভেম্বর ২, ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
ভারতের সীমান্তঘেঁষা দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকায় মাত্র এক দিনের মধ্যে একযোগে ১০৮টি বৌদ্ধ প্যাগোডা নির্মাণ সম্পন্ন করেছে ভুটান। রোববার (১ নভেম্বর) মধ্যরাতের পর কাজ শুরু করে দেশটির ৪০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবী এই বিশাল নির্মাণকাজে সরাসরি অংশ নেন। নদী তীরবর্তী প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ অঞ্চলজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এসব ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া নতুন ‘গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি’ প্রকল্পের আধুনিক কাঠামোর সঙ্গে নিজস্ব আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে সমন্বিত করতেই রাজকীয় উদ্যোগে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বৌদ্ধধর্মে ১০৮ সংখ্যাটিকে অত্যন্ত পবিত্র ও শুভ প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একেকটি প্যাগোডার উচ্চতা ১৫ মিটার বা প্রায় ৫০ ফুট। পাথর ও কাদার সমন্বয়ে নির্মিত এসব কাঠামোকে স্থায়ী প্রার্থনাচিহ্ন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে নির্মাণ এলাকায় প্রায় দুই লাখ মানুষ সমবেত হন, যা হিমালয়কন্যা ভুটানের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক। তিনি উল্লেখ করেন, এক দিনে ১০৮টি প্যাগোডা নির্মাণের এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞ সফলভাবে শেষ করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে শুরুতে কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকলেও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তা সফল হয়েছে।
রাজার দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্পের ওপর ভিত্তি করে ডেনমার্কের বিশিষ্ট স্থপতিদের নকশায় দক্ষিণ সীমান্তের এই নতুন আধুনিক শহর গড়ে তোলা হচ্ছে। ভুটানের নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা, এই মেগা প্রকল্প দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করবে এবং শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা কমাবে। টেকসই বাণিজ্য, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, উন্নত শিক্ষা, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবা খাতে বড় অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই এই শহরের মূল লক্ষ্য।
বর্তমানে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
বেকারত্ব বৃদ্ধি, জন্মহারের নিম্নগতি এবং দক্ষ জনশক্তির বাইরে চলে যাওয়ার মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে তারা। রাজধানী থিম্পু থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ সীমান্তে বর্তমানে মাত্র ১০ হাজার জনসংখ্যার ছোট শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে এই বাণিজ্যিক অঞ্চল। চীন ও ভারতের মাঝে অবস্থিত প্রায় আট লাখ জনসংখ্যার স্থলবেষ্টিত এই রাষ্ট্রটি বস্তুগত উন্নতির পাশাপাশি ‘মোট জাতীয় সুখ’ ধারণার জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত।
২০২৪ সালে রাজকীয় সনদের মাধ্যমে রাজা জিগমে খেসার একটি প্রাণবন্ত অর্থনৈতিক হাব হিসেবে এই অঞ্চলের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করা সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর ইয়ুথ এমপাওয়ারমেন্টের ৬৫ বছর বয়সি প্রধান নিমা গেলতশেন জানান, এই দিনটি ভুটানের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নতুন এই শহরে অর্থায়ন ও পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা আলোচনা থাকলেও বড় বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসছেন।
ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী গৌতম আদানি ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে এই মেগা প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন। এলাকাটিকে ভারতের আসাম রাজ্যের বিস্তৃত রেল যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে শহরটিতে একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালুর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভুটানের ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও। নিজেদের উদ্বৃত্ত জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করে বিটকয়েন উৎপাদনের কাজ করে আসছে দেশটি, যা ভবিষ্যতে এই শহরের উন্নয়নে বড় সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
উদ্বোধনী আয়োজনে অংশ নেওয়া ৫৬ বছর বয়সি স্থানীয় বাসিন্দা বিষ্ণু মায়া মোকতাং নিজের আবেগ প্রকাশ করে জানান, নিজের জীবদ্দশায় এমন একটি বিশ্বমানের শহর গড়ে ওঠার দৃশ্য দেখার সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন