নভেম্বর ১, ২০২৬, ১১:০৪ পিএম
বিশ বছর আগে নেপলসের গির্জা থেকে চুরি যাওয়া সপ্তদশ শতকের এক অমূল্য চিত্রকর্মসহ বহু প্রাচীন নিদর্শন শনাক্ত করে সাংস্কৃতিক সম্পদ উদ্ধারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি।
ছবি বিশ্লেষণ করে বিশ্বের নানা প্রান্তে গোপনে ছড়িয়ে থাকা বা নিলামে ওঠা চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য ও প্রাচীন প্রত্নবস্তু খুঁজে বের করতে আন্তর্জাতিকভাবে এখন বিশেষায়িত এআই সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইউরোপের দেশ ইতালিতে এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ইতোমধ্যে শত শত বহুমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ইতালির পারমা শহরে আয়োজিত একটি প্রাচীন পুরাকীর্তি মেলায় নিয়মিত তল্লাশি চালায় দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা পুলিশ। মেলায় প্রকাশ্যে প্রদর্শিত বিভিন্ন প্রাচীন সামগ্রীর স্থিরচিত্র তুলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে পাঠানো হয়।
সেখানে থাকা স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থা মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একটি চিত্রকর্মকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা পাঠায়।
পরবর্তী আইনি ও কারিগরি তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সপ্তদশ শতকে আঁকা ওই চিত্রকর্মটি মূলত ২০০৪ সালে নেপলসের নিকটবর্তী একটি গির্জা থেকে চুরি হয়েছিল। পরিচয় গোপন করার উদ্দেশ্যে কুচক্রী চোরেরা ছবিটির মূল রঙ ও রূপ পরিবর্তন করে সেটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সাধারণ চিত্রকর্মের অবয়ব দিয়েছিল।
ইতালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালভাতোর রাপিকাভোলি জানান, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে এই বিশেষ প্রযুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর পর থেকে তিন শতাধিক বড় আকারের প্রাচীন তৈলচিত্র ও ভাস্কর্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
একই সঙ্গে মাটির নিচ বা গোপন সংগ্রহশালা থেকে চুরি যাওয়া এক লাখ ৬৫ হাজারের বেশি ক্ষুদ্রাকার প্রাচীন প্রত্নবস্তুও পুনরুদ্ধার করেছে পুলিশ।
উদ্ধারকৃত এসব ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক সম্পদের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ২০ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ।
‘স্টোলেন ওয়ার্কস অব আর্ট ডিটেকশন সিস্টেম’, সংক্ষেপে ‘সোয়াডস’ নামের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিটি রঙের সূক্ষ্ম মাত্রা, ব্রাশের টান, নকশা ও আকৃতির গভীর গাণিতিক মিল বিশ্লেষণ করে কাজ করে। এমনকি কোনো প্রাচীন ছবির কোনো নির্দিষ্ট অংশ কেটে আলাদা করে ফেলা হলেও অথবা রঙ বদলে বিকৃত করা হলেও এই ব্যবস্থা মূল মাস্টারপিসের সাথে তার যোগসূত্র খুঁজে বের করতে পারে।
পাশাপাশি এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক অনলাইন নিলাম প্ল্যাটফর্ম, ই-কমার্স ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্মুক্ত পাতার ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে চোরাই সম্পদের সন্ধান চালায়।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে এআই প্রযুক্তি এককভাবে কোনো শিল্পকর্ম উদ্ধার করতে পারে না। এটি মূলত ডেটাবেজের তথ্য ঘেঁটে কেবল নিখুঁত সাদৃশ্য শনাক্ত করে সংকেত দিতে পারে। পরবর্তীতে সরেজমিন অভিযান, গোয়েন্দা তদন্ত, বিচারিক আইনি পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমন্বয়ের পুরো কাজটির জন্য মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও পেশাদারিত্বের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
এ ছাড়া নিম্নমানের ঝাপসা ছবি, ত্রিমাত্রিক প্রত্নবস্তুর বিভিন্ন দূরবর্তী কোণ থেকে তোলা অস্পষ্ট আলোকচিত্র এবং আধুনিক যুগে নিখুঁতভাবে তৈরি নকল শিল্পকর্ম যাচাই করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির এখনও বেশ কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ইতালি ছাড়াও বর্তমানে তুরস্ক, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্রে চুরি যাওয়া ঐতিহাসিক নিদর্শন পুনরুদ্ধারে বড় পরিসরে এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের নিজস্ব ‘আইডি-আর্ট’ অ্যাপ ও নেটওয়ার্ক বিভিন্ন দেশের জাতীয় ডেটাবেজের সাথে নিখোঁজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তথ্য মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে চোরাই প্রাচীন সামগ্রী শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন