অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ০৯:৫৫ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের কাছে অপরাধের কথা স্বীকার করলে তা সরাসরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো উচিত কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিবিদ ও আইনজীবীদের মাঝে নতুন আইনি ও নৈতিক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অপরাধসংক্রান্ত এসব সংবেদনশীল তথ্য পুলিশকে সরবরাহ করতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক কোনো সুনির্দিষ্ট আইন বা আন্তর্জাতিক নীতিমালা না থাকায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করছে।
একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদের অপরাধের স্বীকারোক্তি এবং চ্যাটবটের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত কথোপকথন তদন্তে আলামত হিসেবে ব্যবহারের ঘটনাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এআই চ্যাটবট। তবে প্রযুক্তির এই অবাধ প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এর অনাকাঙ্ক্ষিত অপব্যবহার এবং অপরাধমূলক কথোপকথনের ঘটনাও ধারাবাহিকভাবে সামনে আসছে।
গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী চ্যাটজিপিটিকে জানায় যে সে গভীর রাতে ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে থাকা ১৭টি গাড়ি ভাঙচুর করেছে।
ঘটনার বিবরণ দেওয়ার পর সে চ্যাটবটের কাছে জানতে চায়, এই অপরাধের কারণে তাকে কি জেলে যেতে হবে?
পুলিশের তদন্ত নথিতে উঠে এসেছে, চ্যাটজিপিটি তখন তাকে ধরা পড়লে সম্ভাব্য আইনি পরিণতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়। কিন্তু বার্তাগুলো ক্রমান্বয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলে চ্যাটবটটি তাকে জরুরি সেবা নম্বর ৯১১-এ ফোন করার পরামর্শ দেয়।
পরবর্তীতে তদন্তের স্বার্থে পুলিশের কাছে নিজের মোবাইল ফোন পরীক্ষার অনুমতি দেয় ওই শিক্ষার্থী।
তদন্তকারী দল সেখান থেকে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে হওয়া কথোপকথনের সম্পূর্ণ ইতিহাস উদ্ধার করে। আদালতে এই ডিজিটাল কথোপকথন অকাট্য প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে গুরুতর সম্পত্তি বিনষ্টের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়ও সম্প্রতি এমন আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে।
আদালতের নথি বলছে, গত এপ্রিলে দুই কলেজশিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে তাদের রুমমেট চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কোনো মানুষকে কালো আবর্জনার ব্যাগে ভরে ময়লার পাত্রে ফেলে দিলে কী ঘটে? পরবর্তীতে ওই দুই নিখোঁজ শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এদিকে স্কুল প্রাঙ্গণে বন্দুক হামলার তথ্য গোপন রাখার অভিযোগে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রাদেশিক সরকার চ্যাটজিপিটির মূল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা ঠুকে দিয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে করা এই মামলার সঙ্গে একটি বিদ্যালয়ে সংঘটিত বর্বরোচিত বন্দুক হামলার ঘটনা জড়িত, যে হামলায় অধিকাংশই শিশু এমন নয়জন নিহত এবং আরও ২৭ জন গুরুতর আহত হয়েছিল।
মামলার বিবরণীতে অভিযোগ আনা হয়, হামলাকারীর সঙ্গে চ্যাটজিপিটির সন্দেহজনক কথোপকথন চললেও সেই তথ্য স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে ওপেনএআই।
বাদীপক্ষে দাবি করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি যদি সময়মতো পুলিশকে সতর্কবার্তা পাঠাত, তবে এই রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি হয়তো ঠেকানো সম্ভব হতো।
এই মারাত্মক ঘটনার প্রেক্ষিতে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান একটি চিঠির মাধ্যমে প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে কয়েকজন তথ্য ফাঁসকারী জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জুন মাসেই হামলাকারীর সঙ্গে চ্যাটজিপিটির বার্তা চালাচালি সন্দেহজনক হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হয়েছিল। তথ্য ফাঁসকারীদের দাবি, সেই সময় বিষয়টি পুলিশকে দ্রুত জানানোর বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দলের লিখিত সুপারিশ থাকলেও অল্টম্যান এবং প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিলেন।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই চ্যাটবটের সঙ্গে ব্যবহারকারীদের এমন স্পর্শকাতর আলাপের গোপনীয়তা ও আইনি সুরক্ষার সীমানা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।
অস্ট্রেলিয়ার একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দেখা যায় শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার মতো ভয়াবহ মানসিক আঘাত কোনো দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তুলনায় অনলাইনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে বেশি প্রকাশ করছে।
আইনজীবী ও মক্কেলের মধ্যকার পরামর্শ কিংবা চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যকার চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে যে কঠোর পেশাগত গোপনীয়তার সুরক্ষা পাওয়া যায়, এআই চ্যাটবটের সঙ্গে সাধারণ ব্যবহারকারীর কথোপকথনে তেমন কোনো আইনি সুরক্ষা বলবৎ থাকে না।
এর ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে যেকোনো তদন্তের স্বার্থে ব্যবহারকারীর সব তথ্য সরাসরি তদন্ত সংস্থার হাতে তুলে দিতে পারে।
চ্যাটবটের মাধ্যমে অপরাধের আগাম স্বীকারোক্তি পেলে তা পুলিশকে জানানো বাধ্যতামূলক করা উচিত কি না, সে বিষয়ে গবেষকেরা অবশ্য এখনো সম্পূর্ণ একমত হতে পারছেন না।
কারণ এআইয়ের জটিল অ্যালগরিদম অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বক্তব্যের রূপক অর্থ বা প্রকৃত উদ্দেশ্য সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আইনি বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া অন্য ধরনের ঝুঁকি ও ভোগান্তি তৈরি করতে পারে।
এর বাস্তব প্রমাণ মেলে গত জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায়, যেখানে অ্যানথ্রপিকের ক্লড ৫ নামের এআই চ্যাটবট একটি পুরোনো অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য দিয়ে খোদ পুলিশের জরুরি হটলাইনে অভিযোগ ঠুকে বসেছিল। এ ধরনের অস্বাভাবিক ত্রুটি অপরাধ শনাক্তকরণ ও তদন্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন