অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে একটি গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় ভূগর্ভ থেকে তীব্র বেগে বেরিয়ে আসা গ্যাসে লাগা আগুন চার দিন ধরে একটানা জ্বলছে। দিন-রাত অবিরাম জ্বলতে থাকা এই আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য আপাতত কোনো ধরনের তৎপরতা না চালানোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বরং মাটির নিচে গ্যাসের অভ্যন্তরীণ প্রবাহ ও ভূগর্ভস্থ চাপ সতর্কতার সাথে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে জরুরিভাবে ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল থেকে উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত ছোটখাল সেতুসংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
পুরো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটি শনাক্ত করার জন্য চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর পাশাপাশি লাল পতাকা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের ভেতরে যেকোনো সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও জমায়েত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
প্রশাসনের নির্দেশনায় ওই নির্ধারিত নিরাপত্তা অঞ্চলের ভেতরে কোনো ধরনের আগুন জ্বালানো, ধূমপান করা, দিয়াশলাই কিংবা লাইটার ব্যবহারসহ যেকোনো অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন সব কার্যক্রম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভূগর্ভস্থ গ্যাসের প্রবল প্রবাহ অব্যাহত থাকলেও আগুন নেভানো কিংবা গ্যাসের মুখ কৃত্রিমভাবে বন্ধের চেষ্টা না করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের জোরালো আশঙ্কা, মাটির নিচ থেকে নির্গত গ্যাসের প্রাকৃতিক বহির্গমন পথ হঠাৎ বলপ্রয়োগ করে বন্ধ করে দিলে ভূগর্ভে অতিরিক্ত বায়বীয় চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
একপর্যায়ে ভূগর্ভস্থ সেই অতিরিক্ত চাপ ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। এমনকি বিকল্প কোনো ফাটল সৃষ্টি করে ভূগর্ভের অন্যান্য উন্মুক্ত অংশ দিয়ে গ্যাস অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ে নতুন কোনো মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
এমন চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কোনো ধরনের তাড়াহুড়া না করে আপাতত স্বাভাবিক গ্যাস নির্গমন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর পেট্রোবাংলা কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস)-এর সভাপতিত্বে ওই জরুরি বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, কক্সবাজার জেলা ও উখিয়া উপজেলা প্রশাসন, এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রযুক্তিবিদরা অংশ নেন।
বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত হয় যে এই মুহূর্তে গ্যাসের মুখ আটকানো বা আগুন নেভানোর চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হবে।
ইতিমধ্যে মাটির গভীর থেকে নির্গত এই প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎস, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও সম্ভাব্য ভূতাত্ত্বিক মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে নমুনা সংগ্রহ করেছে বাপেক্সের প্রতিনিধিদল।
প্রাথমিকভাবে টানা অন্তত ১৫ দিন এই গ্যাসের নির্গমন প্রবাহ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবে সংস্থাটি।
এই দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপের ওঠানামা ও নির্গমনের হার গভীরভাবে পর্যালোচনা করবেন পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা।
১৫ দিনের মধ্যে মাটির নিচ থেকে আসা গ্যাসের প্রবাহ নিজে থেকেই কমে আসে কি না, তা যাচাই করা হবে। এরপর সার্বিক পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করে পরবর্তী করণীয় সংক্রান্ত চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার জানান, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সার্বিক নিরাপত্তা সুরক্ষিত করতেই দ্রুত নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ এবং ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বাপেক্সের প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনেই প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তিনি স্থানীয় এলাকাবাসীকে সার্বক্ষণিক নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করার এবং প্রশাসনের জারিকৃত প্রতিটি সতর্কবার্তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার জোর আহ্বান জানিয়েছেন।
চার দিন ধরে দিন-রাত ভূগর্ভস্থ গ্যাস এভাবে প্রজ্বলিত থাকায় ঘটনাস্থল ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় নিরাপত্তা সতর্কতা সর্বোচ্চ জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত এই ভৌগোলিক বলয়ে জনসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বলবৎ থাকবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন