শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬,

ইরান যুদ্ধের শঙ্কায় গণকবর খোঁড়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে মার্কিন সেনাবাহিনী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ১০:০৩ পিএম

ইরান যুদ্ধের শঙ্কায় গণকবর খোঁড়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে মার্কিন সেনাবাহিনী

ছবি: সংগৃহীত

ভবিষ্যতে বড় ধরনের কোনো সামরিক সংঘাতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য নিহত হওয়ার আশঙ্কায় যুদ্ধক্ষেত্রে গণকবর খোঁড়ার বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। যুদ্ধক্ষেত্রের চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রাণ হারানো সেনাদের মরদেহ সাময়িকভাবে মাটির নিচে সমাহিত করার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে এই ব্যতিক্রমী মহড়া চালানো হচ্ছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বরাতে জানা গেছে, ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের রক্তক্ষয়ী কোরীয় যুদ্ধের পর দেশটির সামরিক বাহিনীকে এমন গণকবর খোঁড়ার প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হয়নি। ঐতিহাসিক ওই কোরীয় যুদ্ধে প্রায় ৩৭ হাজার মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন এক সংবেদনশীল সময়ে এই মহড়া শুরু হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে ওয়াশিংটন বড় ধরনের সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে বলে নানা আন্তর্জাতিক মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

মার্কিন সাময়িকী নিউজউইকের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলমান তীব্র যুদ্ধের মাঝে রণাঙ্গনে ব্যাপক সংখ্যক সেনা হতাহত হলে উদ্ভূত পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা মাঠপর্যায়ে অনুশীলনের অংশ হিসেবেই এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, দেশটির নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থিত থার্ড কর্পস সাসটেইনমেন্ট কমান্ড এবং টোয়েন্টিয়েথ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের সেনাসদস্যরা সরাসরি এই মহড়ায় যুক্ত হন।

তাঁদের সঙ্গে সামরিক ধর্মীয় সহায়তা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক ধর্মযাজকেরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

মহড়ায় ভারী মাটি খোঁড়ার অত্যাধুনিক প্রকৌশল যন্ত্র ও খননযন্ত্র ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ে যাচাই করা হয়, কীভাবে চরম সংঘাতের মধ্যেও নিহত সেনাদের মরদেহ শতভাগ অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করা সম্ভব।

যুদ্ধকালীন তাৎক্ষণিক দাফন শেষে পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মরদেহগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিচয় শনাক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার আগপর্যন্ত এই সংরক্ষণ পদ্ধতির সার্বিক কার্যকারিতা যাচাই করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

ইরাক ও আফগানিস্তানে পরিচালিত সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী কোনো ধরনের উন্মুক্ত অস্থায়ী কবর খোঁড়ার পরিবর্তে নিহত সেনাদের কফিন সরাসরি বিশেষ বিমানে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিষ্ঠিত রীতি অনুসরণ করত।

সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, দ্রুততার সাথে কবর তৈরির পাশাপাশি মহড়ার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সামরিক নীতি মেনে অস্থায়ীভাবে মরদেহ সমাহিত করার প্রচলিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো বাস্তবে কার্যকর কি না, তা পরীক্ষা করা।

যুদ্ধক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগে মরদেহ সুরক্ষিত ও অক্ষত রাখা সম্ভব হলে সংঘাত অবসানের পর ফরেনসিক ও নৃতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা অতি সহজে সেগুলো মাটি থেকে উত্তোলন, পরিচয় নিশ্চিত এবং নিজ দেশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফেরত পাঠানোর আইনি ও কারিগরি প্রক্রিয়া শেষ করতে পারবেন।

মার্কিন সামরিক বিধান অনুযায়ী, রণাঙ্গনে নিহত যেকোনো সেনাসদস্যের মরদেহের সর্বোচ্চ সম্মানজনক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে তাঁর সঠিক পরিচয় শনাক্তকরণের দায় প্রতিটি স্তরের সেনাসদস্য ও নেতৃত্বের ওপর বাধ্যতামূলকভাবে বর্তায়।

মহড়া চলাকালে থার্ড কর্পস সাসটেইনমেন্ট কমান্ডের দায়িত্বশীল সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস ডেলবার্ট রুডে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান, উচ্চমাত্রার যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া সেনাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, তাঁদের মরদেহের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি করেছে এই মহড়া।

তিনি উল্লেখ করেন, হঠাৎ করেই কোনো যুদ্ধ বেঁধে গেলে অতীতে তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে অনভ্যস্ত অবস্থায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হতো।

কিন্তু বর্তমানে তাঁরা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করছেন, যাতে চরম দুর্যোগেও নিহত সেনাদের মরদেহের ওপর পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে এবং তাদের সর্বোচ্চ সম্মানের সঙ্গে রক্ষা করা যায়।

ফোর্ট ব্র্যাগে সমাপ্ত হওয়া এই যৌথ মহড়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় পর মার্কিন সেনাবাহিনীর ধর্মযাজক ও ধর্মীয় বিষয়ক কর্মকর্তারা যুদ্ধক্ষেত্রে অস্থায়ীভাবে গণকবরে মরদেহ সমাহিত করার সময় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও সহায়তা প্রদানের সরাসরি পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলেন।