অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ)।
একই ধরনের প্রস্তুতিকাল অনুমোদন করা হয়েছে আরেক প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালের ক্ষেত্রেও।
উত্তরণের আনুষ্ঠানিক ধাপ কার্যকরের আগে দেশের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক খাতে জরুরি সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিখুঁতভাবে শেষ করতে বাংলাদেশ ও নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে এই অতিরিক্ত সময়সীমার আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সর্বসম্মত সম্মতিতে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।
চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই দিনের মাথায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (ইউএনসিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়ে উত্তরণ প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অনুরোধ পেশ করে।
গৃহীত সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে থাকা বহুমুখী ও জটিল চ্যালেঞ্জগুলোর বাস্তবতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
জাতিসংঘ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সৃষ্ট চরম বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর নজিরবিহীন অনিশ্চয়তা ও নানামুখী ঝুঁকির চাপ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তীব্র অনিশ্চয়তা, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ধাক্কার দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রভাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছরের বিশেষ প্রস্তুতিকাল মঞ্জুর করা হয়েছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন কাঠামোয় কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর সরাসরি কারণ হিসেবে সাধারণত বিবেচনা করা হয় না।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের বহুমাত্রিক জটিলতা ও বিশেষ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য গভীর বিবেচনার দাবি রাখে বলে অভিমত দেওয়া হয়।
ঘোষণায় বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন জটিল উপাদান সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক বহিরাগত সংকটের ক্ষতিকর প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে দেয় এবং এসব বিরূপ পরিস্থিতি সফলভাবে সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতাকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
জাতিসংঘের এই প্রস্তাবে বর্ধিত তিন বছর মেয়াদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সরাসরি কারিগরি সহায়তা গ্রহণ এবং দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী ও প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের সাথে কার্যকর সমন্বয় ঘটিয়ে ‘জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল’ বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই জাতীয় কৌশল বাস্তবায়নের মাঠপর্যায়ের সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে ইউএনসিডিপির কাছে আনুষ্ঠানিক বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের জন্যও বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক আবেদনপত্রটি পাওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ইউএনসিডিপির ২৮তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে অনুরোধটি বিশদ মূল্যায়নের লক্ষ্যে একটি বিশেষ বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) এ বিষয়ে আরও গভীর পর্যালোচনা শেষে সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আনুষ্ঠানিক সুপারিশ পাঠায়।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদনটির ওপর দীর্ঘ ও গঠনমূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্ম জি-৭৭ এই প্রস্তাবের প্রতি বলিষ্ঠ সমর্থন জানায়।
পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) বাংলাদেশের এই যৌক্তিক দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিল।
আন্তর্জাতিক এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশি পণ্যের বৈশ্বিক রপ্তানির ক্ষেত্রে গড়ে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের যে আসন্ন তীব্র ঝুঁকি ছিল, তা থেকে আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে দেশের বাণিজ্য খাত।
রপ্তানি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া টেকসই করা এবং বাণিজ্য ধাক্কা এড়াতে স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের প্রতি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর জোর তাগিদ দিয়ে আসছিলেন।
নতুন এই সিদ্ধান্তের সুবাদে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক প্রধান প্রধান রপ্তানি বাজারে আগের মতোই সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার বহাল থাকবে।
বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিকারকেরা বিশ্বের ৩৮টি দেশ ও আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে বিশেষ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ভোগ করছেন।
যার ফলে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই সরাসরি এলডিসিভিত্তিক এই অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য কাঠামোর আওতায় সুরক্ষিত রয়েছে।
জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি মৌলিক মানদণ্ড—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (ইভিআই)—একসঙ্গে পূরণ করায় চলতি বছরই বাংলাদেশের এলডিসি তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের কথা ছিল।
এর আগে ২০১৮ সালের পর জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক স্বাধীন পর্যালোচনায় বাংলাদেশ এই তিনটি সূচকেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। তবে পরবর্তীতে ভয়াবহ করোনাভাইরাস মহামারির আঘাত বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত দুই বছর সময় মঞ্জুর করেছিল জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের সর্বশেষ ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) উত্তরণ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক হাজার ৩০৭ ডলার।
সেই সময় বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ছিল দুই হাজার ৬৮৪ ডলার, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি।
একই পর্যালোচনায় মানবসম্পদ সূচকের ন্যূনতম উত্তরণ মান নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৯ দশমিক ৬ পয়েন্ট। সেখানে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭৭ দশমিক ৫ পয়েন্ট।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও ভঙ্গুরতা বিবেচনায় অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের সর্বোচ্চ সহনশীল সীমা ছিল ৪০ দশমিক ৬ পয়েন্ট। এই সূচকে কম পয়েন্ট ইতিবাচক হিসেবে গণ্য হওয়ায় বাংলাদেশের স্কোর ছিল মাত্র ২১ দশমিক ৯ পয়েন্ট।
নির্ধারিত সব কটি মানদণ্ড সাফল্যের সাথে পূরণ করলেও উত্তরণ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সামাল দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখাই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় জাতীয় পরীক্ষা।
বিশ্বের বৃহত্তম এলডিসি অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহায়তার সবচেয়ে বড় একক সুবিধাভোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এই রূপান্তর প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল।
চলমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের ভেতরে থেকেই এই বিশাল অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা গত কয়েক দশকের অর্জিত সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।
এর আগে ২০২১ সালের ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ইউএনসিডিপির দ্বিতীয় ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় বাংলাদেশকে এলডিসি তালিকা থেকে বের হয়ে আসার বিষয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়েছিল। তারও আগে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এই তিনটি মানদণ্ডই একযোগে অর্জন করে।
জাতিসংঘের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো দেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের আনুষ্ঠানিক যোগ্যতা অর্জনের জন্য নির্ধারিত তিনটি প্রধান সূচকের মধ্য থেকে অন্তত দুটি সূচক পূরণ করা বাধ্যতামূলক।
এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশই একমাত্র স্বল্পোন্নত দেশ, যা একযোগে তিনটি কঠিন মানদণ্ডই সফলভাবে পূরণ করতে পেরেছে। তবে আন্তর্জাতিক বিধান অনুসারে, উত্তরণের প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জনের পরও ধারাবাহিকতা প্রমাণের জন্য পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় এই অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়।
২০১৯ সালের জাতিসংঘের মূল্যায়নে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় ছিল এক হাজার ৮২৭ ডলার, যা তৎকালীন জাতিসংঘ নির্ধারিত এক হাজার ২২২ ডলারের নির্ধারিত সীমার চেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে বেশি ছিল।
সেই সময় মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের অর্জন ছিল ৭৫ দশমিক ৩ পয়েন্ট, যেখানে আন্তর্জাতিক সর্বনিম্ন সীমা ধরা হয়েছিল ৬৬ পয়েন্ট। আর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে বাংলাদেশের পয়েন্ট ছিল ২৭ দশমিক ৩, যা উত্তরণের জন্য জাতিসংঘ নির্ধারিত সর্বোচ্চ ৩২ পয়েন্টের সীমার অনেক নিচে অবস্থান করছিল।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন