অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ১১:১০ পিএম
মাথার ওপর ভাঙা টিনের ছাউনি আর চারদিকে তীব্র অভাবের সংসার। অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধ। সংসারের টানাটানি সামাল দিতে তাঁর স্ত্রীও স্থানীয় একটি খাবার হোটেলে দিনভর মসলা বাটার কাজ করেন।
এমন চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যেও হৃদয়ে দীর্ঘদিন ধরে লালন করছিলেন এক অসম্ভব স্বপ্ন। সেই স্বপ্নটি হলো পবিত্র মক্কায় গিয়ে হজ পালন করা। অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয় নিয়ে মাত্র ২০ হাজার টাকা সম্বল করে সুদূর সৌদি আরবের উদ্দেশে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করেছেন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ৬০ বছর বয়সী দিনমজুর আব্দুর রহিম।
তিনি শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের আমিনপুর আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল দশটার দিকে নিজ বাড়ি থেকে তিনি একাকী এই দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করেন।
তবে সীমিত অর্থ নিয়ে কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানো এবং হজের আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
শুক্রবার বিকেলে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বসতভিটা বলতে দাঁড়িয়ে আছে কেবল একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর। বৃষ্টির পানি আটকাতে ঘরের টিনের চালের ওপর বিছিয়ে রাখা হয়েছে পলিথিন।
এই ঘরেই স্ত্রী রহিতন বিবিকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি।
রহিতন বিবি জানান, তাঁর স্বামী অন্যের খেতে দিনমজুরি করে যা উপার্জন করতেন, তা দিয়ে দৈনন্দিন খাবার জোগাড় করাই কঠিন ছিল।
সংসার চালাতে তিনিও হোটেলে কাজ শুরু করেন। তাঁদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।
তিনি আরও জানান, প্রায় ছয় বছর আগে বরিশালের চরমোনাইয়ে অনুষ্ঠিত একটি ধর্মীয় মাহফিলে গিয়েছিলেন আব্দুর রহিম।
সেখান থেকে ফেরার পর থেকেই তাঁর মধ্যে যেভাবেই হোক পবিত্র হজ পালনের তীব্র ইচ্ছা জাগ্রত হয়। এরপর থেকে প্রতিটি সুযোগেই তিনি হজে যাওয়ার স্বপ্নের কথা বলতেন, কিন্তু চরম অভাবের কারণে সেই ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
রহিতন বিবি বলেন, স্বামীর এই পবিত্র ইচ্ছা পূরণে তিনি কখনো বাধা দেননি। শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করছেন যেন তাঁর স্বামীর মনের আশা পূরণ হয়। তবে দীর্ঘ পথের সম্বল হিসেবে স্বামীর কাছে ঠিক কত টাকা আছে, তা নিশ্চিত না হওয়ায় তাঁর মনে চরম উদ্বেগ রয়েছে।
গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, শফিকুল ইসলাম ও সুলতান মাহমুদসহ অন্তত ১০ জন প্রতিবেশী জানান, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে কাজের ফাঁকে কিংবা অবসরে সবসময়ই আল্লাহর কাছে হজে যাওয়ার আকুল প্রার্থনা করতেন আব্দুর রহিম।
অর্থ সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন স্থান থেকে কাটা গাছের গোড়া ও মোথা কুড়িয়ে এনে লাকড়ি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন। এভাবে দীর্ঘদিনের রক্ত পানি করা পরিশ্রমে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জমাতে সক্ষম হন তিনি।
প্রতিবেশীরা আরও জানান, প্রায় দুই বছর আগে অনেক কষ্টে একটি পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন আব্দুর রহিম। কিন্তু আর্থিক সংগতি না থাকায় সৌদি আরবের ভিসা সংগ্রহ করতে পারেননি। শেষমেশ সেই সঞ্চিত সামান্য অর্থ পকেটে নিয়েই পায়ে হেঁটে মক্কার পথে পা বাড়িয়েছেন তিনি।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর গলায় ঝোলানো ছিল একটি পরিচিতিমূলক নেমপ্লেট, যাতে পায়ে হেঁটে হজ পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রার কথা লেখা ছিল। হাতে ধরা ছিল বাংলাদেশের একটি লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা।
গ্রামের মানুষ তাঁর এই অদম্য স্পৃহা দেখে বিস্মিত হলেও তাঁর শারীরিক নিরাপত্তা ও সীমান্ত পারাপারের বাস্তবতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেশীদের প্রত্যাশা, কোনো দানশীল ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্থা পাশে দাঁড়ালে হয়তো তাঁর এই স্বপ্নপূরণের পথ সুগম হতে পারে।
ভবানীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. নাজির হোসেন জানান, আব্দুর রহিম তাঁর কাছ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের একটি নাগরিকত্ব সনদপত্র নিয়েছেন এবং তিনি লোকমুখে শুনেছেন যে তিনি পায়ে হেঁটে হজের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছেন।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম, ভিসা সংগ্রহ ও সৌদি আরবে হজের দাপ্তরিক অনুমতির জটিলতার মুখে মাত্র ২০ হাজার টাকার এই অসম সাহসিক যাত্রা শেষ পর্যন্ত কীভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন