নভেম্বর ১, ২০২৬, ১২:২১ পিএম
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির (ChatGPT) পরামর্শকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে। সিয়াটলে বসবাসকারী ৩১ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী বোয়েন ওয়ানের অকালমৃত্যুর ঘটনায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই (OpenAI) এবং এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে আইনি মামলা দায়ের করেছেন তার মা-বাবা। পরিবারের অভিযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভ্রান্ত ও বিপজ্জনক দিকনির্দেশনা অনুসরণ করার কারণেই প্রাণ হারিয়েছেন তাদের কন্যা।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে এসেছে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তীব্র মৃগীরোগের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে মারা যান বোয়েন। মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই চ্যাটজিপিটির তৈরি করে দেওয়া একটি ধাপে ধাপে সময়সূচি অনুসরণ করে প্রতিদিনের খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের ওষুধের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে আনছিলেন।
মৃত্যুর কয়েক দিন আগে চীনে বসবাসকারী বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছিলেন বোয়েন। কথা বলার একপর্যায়ে তিনি হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যান, যা দেখে তার বাবার ধারণা হয়েছিল তিনি হয়তো কোনো গুরুতর খিঁচুনির শিকার হয়েছেন। এরপর টানা কয়েক দিন ফোন করে মেয়ের কোনো সাড়া না পেয়ে চীনে অবস্থানরত মা-বাবা সিয়াটলে এক পরিচিত বন্ধুকে বোয়েনের বাসায় খোঁজ নিতে পাঠান।
ওই বন্ধু সিয়াটলের ফ্ল্যাটে গিয়ে বোয়েনের নিথর দেহ আবিষ্কার করেন। সেই সময় ভিডিও কলে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বোয়েনের বাবা-মা। মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে তারা ভেঙে পড়েন। চিকিৎসাগত পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে অনিয়ন্ত্রিত মৃগীরোগের জটিলতাই এই মৃত্যুর কারণ, অথচ গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নিয়মিত ওষুধ সেবন করে এই দীর্ঘমেয়াদি রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন তিনি।
মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক ব্যাধি মৃগীরোগ বা এপিলেপসিতে আক্রান্ত রোগীরা নিয়মিত খিঁচুনিতে ভোগেন। বোয়েন প্রতিদিন ৪০০ মিলিগ্রাম ল্যামোট্রিজিন ওষুধ সেবন করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। কিন্তু তার ধারণা হয়েছিল, এই নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার কথা বলার গতি কিছুটা মন্থর ও জড়তাপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সামনে চাকরির সাক্ষাৎকার থাকায় তিনি মানসিক উদ্বেগে ভোগেন। তার আশঙ্কা ছিল, কথা বলার সামান্য সমস্যা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তার বৈধ ভিসার অবস্থানও নষ্ট হতে পারে।
এই দুশ্চিন্তা থেকেই তিনি চ্যাটজিপিটির সঙ্গে নিজের ওষুধের মাত্রা কমানো নিয়ে সরাসরি আলোচনায় জড়ান। অভিযোগ উঠেছে, কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুমতি নেওয়া ছাড়াই এআই চ্যাটবটটি তাকে ওষুধ কমিয়ে আনতে প্রত্যক্ষভাবে উৎসাহিত করে। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ৪০০ মিলিগ্রাম থেকে কমিয়ে ৩০০ এবং পরবর্তীতে ২০০ মিলিগ্রামে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করে চ্যাটবটটির পরামর্শ চান তিনি। জবাবে চ্যাটবটটি তার প্রস্তাবকে সমর্থন করে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওষুধের ডোজ শূন্যে নামিয়ে আনার একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রোডম্যাপ তৈরি করে দেয়।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, চিকিৎসকদের থেকে ওষুধ কমানোর তথ্য গোপন রাখতে এবং নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা এড়িয়ে যেতেও চ্যাটবটটি তাকে প্ররোচিত করেছিল।
বোয়েনের মৃগীরোগের নিয়মিত চিকিৎসক ডা. নিকোলাস পুলস জানিয়েছেন, যে ওষুধটি রোগীর শরীরে সফলভাবে কাজ করছিল তা কোনোভাবেই বন্ধ বা কমানোর নির্দেশ দেওয়া সম্ভব ছিল না, এবং চিকিৎসকের দৃষ্টিতে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া গুরুতর অবহেলার শামিল।
অ্যামাজন থেকে চাকরি হারানোর পর একাকিত্বে দিন কাটানো বোয়েন নিজের ব্যক্তিগত শঙ্কা ও অনুভূতি ভাগ করে নিতে চ্যাটজিপিটিকে নিজের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভাবতে শুরু করেছিলেন। জনসমক্ষে খিঁচুনির ভয়ে তিনি ঘরের বাইরে বের হওয়াও কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
আদালতে দাখিল করা চ্যাট রেকর্ডে দেখা গেছে, একপর্যায়ে চ্যাটবটটি তাকে বার্তা পাঠিয়েছিল যে পরদিন কোনো ওষুধ না খাওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বাস্তবসম্মত এবং শারীরিক অস্থিরতা তৈরি হলে তা মূলত মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সুস্থতারই লক্ষণ। বোয়েন নিজের শারীরিক ভয় প্রকাশ করলে চ্যাটবটটি আশ্বস্ত করে বলে যে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
মামলার বিষয়ে ওপেনএআই-এর মুখপাত্র ড্রু পুসাতেরি জানিয়েছেন, ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তবে তার দাবি, বোয়েন যে মডেলটি ব্যবহার করেছিলেন তা পরবর্তীতে পরিবর্তন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, চ্যাটজিপিটি চিকিৎসাসেবার বিকল্প নয়, তবে মানুষ যেন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বুঝতে পারে এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে আলাপের প্রস্তুতি নিতে পারে, সেজন্য প্রযুক্তিটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। আদালতের সামনে এখন এই প্রাণঘাতী এআই পরামর্শের আইনি দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন