রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬,
স্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ব

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নেগেটিভ হলেও জ্বর যা বলছেন দেশের শীর্ষ চিকিৎসকেরা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

নভেম্বর ১, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নেগেটিভ হলেও জ্বর যা বলছেন দেশের শীর্ষ চিকিৎসকেরা

ছবি: সংগৃহীত

দেশে সম্প্রতি তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড শরীরব্যথা, মাথাব্যথা ও চরম শারীরিক দুর্বলতার মতো উপসর্গ নিয়ে বহু মানুষ হাসপাতালে শরণাপন্ন হচ্ছেন। কিন্তু রক্ত ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পর অনেকের ক্ষেত্রেই ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার ফলাফল নেগেটিভ আসছে। চিকিৎসাগত পরীক্ষার রিপোর্ট স্বাভাবিক এলেও শারীরিক যন্ত্রণার কোনো উপশম না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—তবে কি দেশের অভ্যন্তরে নতুন কোনো অজানা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন কোনো ভাইরাসের অস্তিত্ব এখনো মেলেনি।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বরে আক্রান্তদের মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন কোনো ভাইরাসের অনুপ্রবেশ বা সংক্রমণের বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম জানান, বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু ও হামসহ কয়েকটি পরিচিত সংক্রামক রোগের নিয়মিত বিস্তার দেখা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণও স্বাভাবিকভাবেই বিস্তার লাভ করছে।

তিনি উল্লেখ করেন, আইইডিসিআরের নিয়মিত সার্ভিল্যান্স কার্যক্রমে নতুন কোনো রোগজীবাণু শনাক্ত হয়নি। ইনফ্লুয়েঞ্জা পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা চলছে। তবে সারা দেশের প্রতিটি রোগীর ল্যাব পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে তাদের পক্ষে করা সম্ভব নয়।

চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ এলেও রোগীর শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা, রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) কিংবা অ্যাডিনোভাইরাসের মতো অন্যান্য পরিচিত ভাইরাসের সংক্রমণ থাকতে পারে। এসব রোগের ক্ষেত্রে সব সময় ব্যয়বহুল ল্যাবরেটরি টেস্ট না করিয়ে চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক লক্ষণ দেখে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। ফলে রোগী সুস্থ হয়ে গেলে জ্বরের সুনির্দিষ্ট নামটি আর আলাদা করে শনাক্ত হয় না।

শিশুদের ক্ষেত্রে আরএসভি ও অ্যাডিনোভাইরাসের মতো শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ বেশি থাকলেও বছরের অন্য সময়েও এর আক্রমণ দেখা যেতে পারে।

একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম সম্প্রতি নিজেই এমন জটিল উপসর্গের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। সহকর্মীদের ডেঙ্গু সংক্রমণ দেখে নিজের জ্বর নিয়েও তিনি শুরুতে শঙ্কিত ছিলেন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রামে থেকে বাড়িতেই ওষুধ সেবন করে তিনি ক্রমান্বয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. নেলসন তাপস মণ্ডল জানান, হাসপাতালে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে মূলত ডেঙ্গু নির্ণয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কোভিড-১৯ বা অন্যান্য বিরল ভাইরাসের পরীক্ষা সচরাচর করানো হচ্ছে না। অনেক রোগী ডেঙ্গুর মতো লক্ষণ নিয়ে এলেও পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ছে না। কারও কারও রক্তকণিকায় কিছুটা পরিবর্তন আসছে, আবার কারও ক্ষেত্রে কোনো অসংগতি ধরা পড়ছে না; অথচ তাদের সেরে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগছে। রোগ নির্ণয়ের বাড়তি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় বহন করাও অনেক সাধারণ রোগীর পক্ষে সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ জানান, নতুন ভাইরাসের আতঙ্কে ভোগার আগে পরিচিত রোগগুলোর দিকে নজর দেওয়া আবশ্যক।

তিনি উল্লেখ করেন, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফয়েড ও নিউমোনিয়ার কারণেও মানুষ জ্বরে ভুগতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বিবেচনায় ভিন্ন সংক্রমণও ঘটতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, ডেঙ্গুর প্রাথমিক টেস্ট নেগেটিভ এলেই রোগটি থেকে পুরোপুরি মুক্ত ভাবা ঠিক নয়। জ্বর শুরুর কত দিন পর এবং কোন পদ্ধতিতে রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভুল ফলাফল নির্ভর করে। অক্টোবর ও সংলগ্ন ঋতুতে আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে প্রায় প্রতি বছরই ভাইরাসজনিত জ্বরের প্রকোপ বাড়ে।

জ্বরে আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও তরল খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তীব্র পেটব্যথা, অবিরাম বমি, রক্তক্ষরণ, হঠাৎ রক্তচাপ বা প্রস্রাব কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত নিস্তেজ হয়ে পড়া অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ। এমন উপসর্গ দেখা দিলে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে যেতে হবে। শিশু, বয়স্ক ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। জ্বর পুরোপুরি সেরে যাওয়ার পরও ডেঙ্গুর গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই জ্বর কমার পরেও চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হবে এবং চিকিৎসকের অনুমোদন ছাড়া প্যারাসিটামল ব্যতীত অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।