অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ১০:৪৬ এএম
গুগলের বাজারমূল্য কমল ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি, যার মূলে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির কারণে প্রচলিত সার্চ বিজ্ঞাপনী আয়ে বড় ধাক্কা। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের এই আর্থিক তথ্য প্রকাশের পর গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারে স্মরণকালের অন্যতম বড় দরপতন ঘটে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগ অব্যাহত রেখে কোম্পানিটি তাদের প্রচলিত সার্চ ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
অ্যালফাবেটের প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা ফিলিপ শিন্ডলার স্বীকার করেছেন, গুগলের চালু করা `এআই মোড` প্রচলিত সার্চ বিজ্ঞাপনের আয়ে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা কোনো সার্চ রেজাল্টের ওয়েব লিংকে না ঢুকে সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর পেয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে সার্চ ফলাফলের পাশে প্রদর্শিত ক্লিকের ওপর নির্ভরশীল প্রচলিত বিজ্ঞাপনগুলো থেকে আগের মতো আয় আসছে না।
তবে সার্চ ইঞ্জিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ভবিষ্যৎ রূপান্তর নিয়ে আত্মবিশ্বাসী শিন্ডলার। তিনি জানিয়েছেন, তাদের অগ্রগতির গতিপথ সন্তোষজনক এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি সফল হবে।
বাস্তবতা হলো, কয়েক দশক ধরে ব্যবহারকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে গুগলের যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তা এখন নজিরবিহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি। বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ এখন তথ্য খোঁজার প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে ChatGPT ও Claude-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন।
গুগলের বিজ্ঞাপন বিভাগের সাবেক প্রধান কিম স্কট আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, অন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম গুগলের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা কেড়ে নেওয়ার আগেই তারা নিজেদের প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্চ বাজারে আধিপত্য পুনর্গঠন করতে চাইছে।
তাঁর মতে, গুগল প্রয়োজনে সাময়িক আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে হলেও নতুন প্রযুক্তি সবার আগে আনবে, কিন্তু অন্যদের কাছে বাজার হারাতে দেবে না। দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত বাজি ধরেই গুগলের পথচলা শুরু হয়েছিল, যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে।
অ্যালফাবেট প্রকাশিত সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে তাদের মোট আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭৬০ কোটি ডলারে।
আয় বাড়লেও তা বাজার বিশ্লেষকদের প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি।
বিজ্ঞাপনী আয় পূর্বাভাস অনুযায়ী না পৌঁছায় বৃহস্পতিবার শেয়ারবাজারে অ্যালফাবেটের শেয়ারের দর ১২ শতাংশের বেশি কমে গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে আসে। আগের দিন বুধবার দিন শেষে কোম্পানির মোট বাজারমূল্য ছিল ৩ লাখ ৯৭ হাজার কোটি ডলার, যা বৃহস্পতিবার দরপতনের পর দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি ডলারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেস্টারের প্রধান বিশ্লেষক ট্রেসি উ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে জানান, গুগলের এই ফলাফল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল উন্নয়ন খরচ জোগানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাকে সমান তালে টিকিয়ে রাখা কতটা জটিল।
একই সপ্তাহে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটও তাদের ত্রৈমাসিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করেছে।
দুই প্রতিষ্ঠানই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ব্যয় চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও তাদের প্রতিষ্ঠিত রাজস্বের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিনিয়োগকারীরা অস্বস্তিতে রয়েছেন। ঘোষণার পরপরই পুঁজিবাজারে অ্যামাজনের শেয়ার দর ৬ শতাংশ হ্রাস পায়।
অ্যামাজন জানিয়েছে, গত প্রান্তিকে তাদের আয় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছালেও প্রতিষ্ঠানটির নগদ অর্থের প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ আয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয় বেশি হয়েছে, যা বিগত তিন মাসে বেড়েছে ছয় গুণ।
অ্যামাজনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জ্যাসি অবশ্য দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা তুলে ধরে জানান, তাদের ক্লাউড সেবা এবং রিটেইল বা খুচরা বিক্রি ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের রাজস্ব এনে দিতে পারে।
তিনি অ্যামাজনের নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কম্পিউটার চিপ উৎপাদন এবং ডেভেলপার প্ল্যাটফর্ম Bedrock-এর দ্রুত প্রসারের কথা উল্লেখ করেন, যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বড় বড় এআই মডেল ব্যবহার করছে।
জ্যাসি জোর দিয়ে বলেন, দুই দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে একটি একক প্রযুক্তি কখনো বিশ্ব শাসন করতে পারে না। বর্তমান প্রতিযোগিতার যুগে ব্যয়কে আগামী ২৫ বছরে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো সুযোগ নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
অন্যদিকে মাইক্রোসফটের আর্থিক ফলাফল প্রকাশের পর বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলক সংযত।
বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দর কমেছে ১ শতাংশেরও কম। OpenAI-এর অন্যতম প্রধান অংশীদার মাইক্রোসফট সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় কমিয়েছে এবং কয়েক হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত প্রান্তিকে মাইক্রোসফটের আয় ১৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২৩০ কোটি ডলারে, যেখানে তাদের ক্লাউড খাতের আয় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছেছে ৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে।
মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা জানান, তাদের প্রযুক্তি সহায়ক Copilot-এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতিদিনের সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ৫০০ শতাংশ বেড়েছে।
ব্যয় সংকোচন ও আয় বৃদ্ধির সমীকরণ থাকা সত্ত্বেও বিশ্লেষক ট্রেসি উ প্রযুক্তি খাতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল চাহিদার ভিড়ে শেষ পর্যন্ত এর প্রকৃত আর্থিক সুফল কোন প্রতিষ্ঠানের কোষাগারে জমা হবে, তা নিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে গভীর হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন